লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD) — গরুর এই মারাত্মক রোগ সম্পর্কে সব কিছু জানুন

লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD) — গরুর এই মারাত্মক রোগ সম্পর্কে সব কিছু 🐂 জানুন 🐄

 

গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গ সহ সারা ভারতে গরুর একটি নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে লাম্পি স্কিন ডিজিজ বা LSD। এই রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরে গোলাকার গুটি দেখা দেয়, দুধ উৎপাদন কমে যায় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে গরুর মৃত্যুও হতে পারে।

LSD রোগটি কী?

লাম্পি স্কিন ডিজিজ একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এটি Capripoxvirus গোত্রের Lumpy Skin Disease Virus (LSDV) দ্বারা সৃষ্ট। এই ভাইরাস মূলত গরু ও মহিষকে আক্রান্ত করে। মশা, মাছি, আঁটুলি পোকা (টিক) এবং সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এটি এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মধ্যে এই রোগ ছড়ায় না।

শরীরের ভেতরে কী ঘটে?

ভাইরাসটি প্রথমে মশা, মাছি বা আঁটুলি পোকার কামড়ের মাধ্যমে গরুর রক্তে প্রবেশ করে। এই পর্যায়কে বলা হয় Viraemia — অর্থাৎ রক্তে ভাইরাসের উপস্থিতি। এই সময় গরুর শরীরে জ্বর আসে কারণ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে।

রক্তের মাধ্যমে ভাইরাস দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং চামড়ার কোষে (dermal cells) প্রবেশ করে। সেখানে ভাইরাস নিজের সংখ্যা বাড়াতে থাকে এবং চামড়ার নিচে তীব্র প্রদাহ (inflammation) তৈরি হয়। এই প্রদাহ থেকেই গোলাকার শক্ত গুটি তৈরি হয়, যা আসলে মৃত কোষ ও রোগ প্রতিরোধকারী শ্বেত রক্তকণিকার জমাট।

এরপর ভাইরাস লসিকাগ্রন্থিতে (lymph nodes) আক্রমণ করে। লসিকাগ্রন্থি ফুলে যায়, বিশেষত কাঁধের সামনে ও পায়ের গোড়ায় এটি স্পষ্ট বোঝা যায়। লসিকা তন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ভেঙে যায়।

একই সময়ে ভাইরাস ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়তে পারে, ফলে শ্বাসকষ্ট ও নাক দিয়ে পানি পড়তে দেখা যায়। মুখের ভেতরে ও পাকস্থলীতেও ঘা তৈরি হতে পারে, যার কারণে গরু খাওয়া বন্ধ করে দেয়। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পড়লে অন্য ব্যাকটেরিয়া সহজেই আক্রমণ করে, ফলে একসাথে একাধিক সংক্রমণ হয় যা গরুর অবস্থা আরও খারাপ করে দেয়।

রোগের লক্ষণ

প্রথম দিকে গরুর হঠাৎ জ্বর আসে, তাপমাত্রা ১০৪–১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। গরু খাওয়া ছেড়ে দেয়, নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং দুধ উৎপাদন হঠাৎ কমে যায়। দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে সারা শরীরে, বিশেষত মাথা, ঘাড়, পিঠ, পেট ও পায়ে গোলাকার শক্ত গুটি দেখা দেয়। গুটিগুলো ২ থেকে ৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হতে পারে। চোখ ও নাক দিয়ে জল পড়ে, মুখে ঘা হতে পারে এবং পা ফুলে যেতে পারে।

রোগ প্রতিরোধে করণীয়

সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সঠিক ভ্যাকসিন দেওয়া। ভারতে LSD-র বিরুদ্ধে Lumpi-ProVacInd ভ্যাকসিন পাওয়া যায়, যা সরকারিভাবে অনুমোদিত। এছাড়া গোয়ালঘর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখুন এবং মশা, মাছি ও আঁটুলি পোকা দূর করতে নিয়মিত কীটনাশক স্প্রে করুন। নতুন গরু কেনার পর অন্তত ১৫ দিন আলাদা রাখুন, আক্রান্ত এলাকা থেকে গরু না কিনলে ভালো হয়।

মশা ও মাছি তাড়ানোর একটি কার্যকর ঘরোয়া উপায় হলো কপূর তেল তৈরি করা। নারকেল তেলের সাথে কপূর মিশিয়ে হালকা গরম করে তৈরি এই তেল গরুর গায়ে হালকা করে মাখিয়ে দিন। এই গন্ধে মশা ও মাছি কাছে আসতে চায় না, ফলে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি অনেকটা কমে।

সন্ধ্যার সময় গোয়ালঘরে ধুনোর সাথে কপূর মিশিয়ে ধোঁয়া দিন। এই ধোঁয়া মশা ও পোকামাকড় তাড়াতে অত্যন্ত কার্যকর এবং এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও গরুর জন্য নিরাপদ।

রোগ হলে কী করবেন

আক্রান্ত গরুকে সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের থেকে আলাদা করুন। গোয়ালঘর জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করুন এবং দ্রুত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা:

জ্বর কমাতে Meloxicam বা Flunixin জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। গুটিতে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঠেকাতে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে। গুটির ঘায়ে Povidone Iodine বা Gentian Violet লাগান।

হোমিওপ্যাথিক সহায়তা:

Thuja Occidentalis 30 এবং Malandrinum 30 LSD-র ক্ষেত্রে সহায়ক বলে অনেক পশুচিকিৎসক মনে করেন। Apis Mellifica 30 ফোলা ও প্রদাহ কমাতে ব্যবহার করা যায়। তবে হোমিওপ্যাথি মূল চিকিৎসার পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করুন, বিকল্প হিসেবে নয়।

আয়ুর্বেদিক সহায়তা:

নিম পাতার রস গুটির উপর লাগালে জ্বালা কমে ও সংক্রমণ প্রতিরোধ হয়। হলুদ ও নারকেল তেল মিশিয়ে ঘায়ে লাগানো যায়। তুলসী, আদা ও গুড় মিশিয়ে খাওয়ালে রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ে।

কখন পশু ভয়ঙ্কর ভাবে অসুস্থ

জ্বর ৪৮ ঘণ্টার বেশি থাকলে, গুটি থেকে পুঁজ বের হলে, গরু সম্পূর্ণ খাওয়া বন্ধ করে দিলে বা পা এতটাই ফুলে যায় যে হাঁটতে পারছে না — এই অবস্থায় দেরি না করে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ পশুচিকিৎসকের সাহায্য নিন।

আপনার গরুর LSD বা অন্য কোনো সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানান — আমি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top