LSD-এর নামে আর কতদিন আপস?
পশ্চিমবঙ্গের গরু বাঁচাতে সঠিক ভ্যাকসিন চাই, বিকল্প নয়
একটা প্রশ্ন করুন নিজেকে—
যে রোগের বিরুদ্ধে আলাদা ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে, সেই রোগের জন্য
বছরের পর বছর বিকল্প ভ্যাকসিন ব্যবহার করা কি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে?
আরও একটা প্রশ্ন করুন—
যখন একজন কৃষক তার শেষ সম্বল গরুটিকে বাঁচানোর জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে,
তখন তার হাতে কি সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক সুরক্ষা তুলে দেওয়া উচিত নয়?
আজ পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার কৃষকের মনে এই প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।
কারণ মাঠে বাস্তবতা এক, আর কাগজে-কলমে বাস্তবতা আরেক।
Lumpy Skin Disease (LSD) আজ আর কোনো দূরের রোগ নয়।
এটি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামবাংলার বাস্তব আতঙ্ক।
একটি আক্রান্ত গরু মানে শুধু একটি পশুর অসুস্থতা নয়; একটি পরিবারের আয় কমে যাওয়া,
ঋণের বোঝা বাড়া, সন্তানের পড়াশোনার খরচ অনিশ্চিত হয়ে পড়া এবং অনেক ক্ষেত্রে
সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কা।
কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ভয়াবহ রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে
আমরা কি সত্যিই সঠিক অস্ত্র ব্যবহার করছি?
LSD কী এবং কেন এটি এত ভয়ংকর?
LSD একটি ভাইরাসজনিত রোগ।
এই রোগে আক্রান্ত গরুর শরীরে শক্ত গুটি তৈরি হয়, তীব্র জ্বর আসে,
দুধ উৎপাদন কমে যায়, প্রজনন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।
সবচেয়ে বড় কথা, এটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়াতে পারে।
মশা, মাছি এবং অন্যান্য রক্তচোষা পোকামাকড়ের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে
সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একবার কোনো এলাকায় রোগ ঢুকলে কৃষকদের রাতের ঘুম উড়ে যায়।
কারণ তারা জানেন—একটি গরু হারানো মানে শুধু একটি প্রাণী হারানো নয়,
একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি হারানো।
LSD-এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র কী?
বিজ্ঞান খুব পরিষ্কার ভাষায় বলছে—
LSD-এর কোনো জাদুকরী ওষুধ নেই।
অ্যান্টিবায়োটিক এই রোগ সারায় না।
ভিটামিন এই রোগ আটকায় না।
E-Sel রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে,
কিন্তু LSD প্রতিরোধ করতে পারে না।
প্রতিরোধের মূল অস্ত্র একটাই—
সঠিক LSD ভ্যাকসিন।
যে ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সেই ভাইরাসকে লক্ষ্য করেই তৈরি হয়েছে LSD ভ্যাকসিন Lumpi-ProVacInd,
ICAR এবং National Research Centre on Equines যৌথভাবে এটি তৈরি করেছে।
এটাই হওয়ার কথা ছিল কৃষকদের প্রধান সুরক্ষা।
কিন্তু মাঠে কী হচ্ছে?
এখানেই শুরু হচ্ছে বড় প্রশ্ন।
পশ্চিমবঙ্গের বহু এলাকায় LSD প্রতিরোধ কর্মসূচির নামে
Goat Pox ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হচ্ছে।
সরকারি মহল বলছে, Goat Pox ভ্যাকসিন LSD-এর বিরুদ্ধে কিছুটা Cross-Protection দেয়।
এই বক্তব্য পুরোপুরি ভুল নয়।
কিন্তু পুরো সত্যও নয়।
কারণ Cross-Protection আর Direct Protection এক জিনিস নয়।
Goat Pox ভাইরাস এবং LSD ভাইরাস একই পরিবারের সদস্য হতে পারে,
কিন্তু তারা একই ভাইরাস নয়।
দুটি রোগ আলাদা। দুটি সংক্রমণ আলাদা।
তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—
যে রোগের জন্য আলাদা ভ্যাকসিন রয়েছে,
সেখানে বছরের পর বছর বিকল্প ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হবে কেন?
অস্থায়ী সমাধান আর স্থায়ী নীতির মধ্যে পার্থক্য আছে
ধরা যাক জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
LSD ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত নেই।
সেই সময় Goat Pox ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হলো।
এটি হয়তো প্রশাসনিকভাবে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত।
কিন্তু সেই অস্থায়ী ব্যবস্থা যদি বছরের পর বছর চলতে থাকে,
তখন সেটি আর জরুরি সমাধান থাকে না।
তখন সেটি নীতিগত ব্যর্থতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
কৃষক জানতে চাইতেই পারেন—
- কেন এখনও পর্যাপ্ত LSD ভ্যাকসিন মাঠে পৌঁছাচ্ছে না?
- কেন এখনও বিকল্প ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে?
- কেন এখনও পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামে প্রকৃত LSD ভ্যাকসিন সহজলভ্য নয়?
সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে কারা?
না, কোনো মন্ত্রী নয়।
না, কোনো বড় অফিসার নয়।
এই বোঝা বহন করছে গ্রামের কৃষক।
আর বহন করছে মাঠপর্যায়ের সেই কর্মীরা,
যারা সামান্য পারিশ্রমিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভ্যাকসিন দিচ্ছেন।
তারা হয়তো নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন।
কিন্তু তাদের হাত দিয়েই এমন একটি ব্যবস্থার বাস্তবায়ন হচ্ছে,
যার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ বাড়ছে।
আজ প্রয়োজন জবাবদিহিতা
এই লেখা কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়।
এই লেখা কৃষকের পক্ষে।
এই লেখা বিজ্ঞানের পক্ষে।
এই লেখা প্রশ্ন করার অধিকারের পক্ষে।
প্রশ্ন একটাই—
যখন LSD-এর বিরুদ্ধে Homologous ভ্যাকসিন রয়েছে,
তখন পশ্চিমবঙ্গের কৃষক কেন এখনও Heterologous ভ্যাকসিনের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হবেন?কৃষক কি পূর্ণ সুরক্ষার অধিকারী নন?
অস্থায়ী ব্যবস্থা কতদিন চলবে?
শেষ কথা
একজন কৃষকের গরু মারা গেলে সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয় না।
কোনো টেলিভিশন বিতর্ক হয় না।
কোনো বড় রাজনৈতিক মিছিল বের হয় না।
কিন্তু সেই কৃষকের কাছে সেটিই তার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
তাই আজ সময় এসেছে স্পষ্ট করে বলার—
কৃষক দয়া চান না।
কৃষক ভর্তুকি চান না।
কৃষক করুণা চান না।কৃষক চান বিজ্ঞানভিত্তিক সুরক্ষা।
কৃষক চান কার্যকর LSD ভ্যাকসিন।
কৃষক চান এমন একটি নীতি, যেখানে আপস নয়, অজুহাত নয়,
বরং গবাদি পশুর জীবন রক্ষাই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
কারণ একটি প্রশ্ন আজ পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে—
LSD-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা কি সত্যিই সর্বোত্তম অস্ত্র ব্যবহার করছি,
নাকি এখনও বিকল্পের ভরসায় ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি?
