অশরীরীর বিচার
প্রথম অধ্যায়: শালবনের ছায়া
বর্ধমান জেলার প্রান্তসীমায়, লালমাটির ঢেউ আর শাল-পিয়ালের ঘন অরণ্যে ঘেরা একটি গ্রাম ছিল—শালবনিয়া। দিনের আলোয় গ্রামটিকে সাধারণ মনে হলেও সন্ধ্যার পর তার চেহারা বদলে যেত। পশ্চিমের শালবন থেকে কুয়াশা নেমে আসত ধোঁয়ার মতো। বাতাসে ভেসে বেড়াত শুকনো পাতার খসখস শব্দ। গ্রামের বয়স্করা বলত, এই শব্দ শুধু বাতাসের নয়—কখনও কখনও মৃতরাও নাকি শাল গাছের আড়ালে হাঁটে। গ্রামের মানুষ ছিল নানা সম্প্রদায়ের। কুমোরপাড়া, মাঝিপাড়া, কর্মকারপাড়া, শেখপাড়া, ব্রাহ্মণপাড়া—সবাই মিলে এক অদ্ভুত সহাবস্থানে বাস করত। কিন্তু তাদের মাথার উপর ছিল এক আতঙ্ক।
সেই আতঙ্কের নাম—মহাদেব সাহা। শালবনিয়ার হাট, ধানের আড়ত, পাটের গুদাম, কাপড়ের দোকান—সবকিছুর সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে জড়িয়ে ছিল মহাদেব। লোকটা ধনী ছিল, কিন্তু তার সম্পদের ভিত্তি ছিল মানুষের কান্না। দুইশো টাকা ধার দিলে দলিলে লিখত পাঁচশো। এক মণ ধান দিলে ফেরত চাইত তিন মণ। সোনার গয়না বন্ধক রাখলে সেটি আর মালিকের হাতে ফিরত না।বছরের পর বছর গ্রামের অসহায় মানুষগুলো তার কাছে মাথা নত করে বেঁচে ছিল।
কিন্ত একজন ছিল, যে মাথা নোয়াতে জানত না। তার নাম অরিন্দম নস্কর। পঁচিশ বছরের যুবক। লম্বা, শক্তসমর্থ, চোখে আগুনের মতো দীপ্তি। গ্রামের ছেলেরা তাকে নেতা মানত। কেউ অন্যায় করলে সে রুখে দাঁড়াত। তার চার সঙ্গী—বিকাশ, রাজু, সুমন আর দেবু। গ্রামের লোকজন মজা করে তাদের ডাকত—”পাঁচ ভূত”। কিন্তু মহাদেব সাহা তাদের অন্য নামে চিনত। “বিপদ।”
এক বর্ষার শেষের বিকেলে শালবনিয়া হাটের মহাপ্রভুর মন্দিরের সামনে বসেছিল পাঁচজন। তখনও আকাশ কালো। দূরে মেঘ গর্জন করছে। ঠিক তখনই ছুটে এল মধু মাঝি। তার মুখ রক্তাক্ত। চোখে জল। গায়ে লাঠির আঘাতের দাগ।
অরিন্দম উঠে দাঁড়াল। —”কে মারল?”
মধু মাঝি কাঁপা গলায় বলল, — “মহাদেব সাহা…”
তারপর যা বলল, তা শুনে পাঁচজনের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। তিন হাজার টাকা ধার নিয়েছিল সে। সুদ-আসলে সেই টাকা শোধ করতেও গিয়েছিল। কিন্তু মহাদেব দাবি করেছে ছয় হাজার তিনশো টাকা। প্রতিবাদ করতেই তার লেঠেল গদাধর তাকে পিটিয়ে বের করে দিয়েছে। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর অরিন্দম ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার কণ্ঠস্বর শক্ত ও গম্ভীর। —”আজ হিসাব হবে।”
সেই সন্ধ্যাতেই পাঁচ যুবক পৌঁছে গেল মহাদেব সাহার বাড়িতে। মহাদেব তখন বারান্দায় বসে হুঁকো টানছিল। অরিন্দমের চোখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
কারণ সে প্রথমবার অনুভব করল— আজ বিচার চাওয়ার সাহস নিয়ে কেও দরবারে এসেছে।
এই মুহূর্তে অরিন্দমের সেই রূপ যদি কেউ দেখে, যখন প্রতিবাদ কোনও যুবকের চোখে আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে, তখন ধনসম্পদ, ক্ষমতা, লেঠেল—কিছুই তাকে বাধা দিতে পারে না।
সেইদিন মহাদেব বুঝে গেছিল বিপদ কি। অরিন্দমের সেই ভয়ংকর রূপ সেদিন মহাদেবের মনের মধ্যে কোথাও একটা ভয় সৃষ্টি করেছিল। সে বুঝে গেছে যে তার সমস্ত পাপের হিসেব নেওয়া শুরু হয়ে গেছে।
__________________________________________________________
দ্বিতীয় অধ্যায়: অপমানের আগুন
মহাদেব সাহার বাড়ির বৈঠকখানায় সেই রাতের ঘটনার কথা পরদিন সকালেই পুরো শালবনিয়া গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল।
কেউ বলল, “এই প্রথম কেউ মহাদেবের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে।”
কেউ বলল, “ছেলেটার বুকের পাটা আছে।”
আবার কেউ ফিসফিস করে বলল, “বেশি উড়ছে। এই আগুন বেশিদিন জ্বলবে না।”
কথাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ালেও মহাদেব সাহার কানে পৌঁছাতে দেরি হলো না। সকালের চা খেতে খেতে সে বারান্দায় বসেছিল। হাতে দামি রুপোর গ্লাস। কিন্তু আজ চায়ের স্বাদ তার কাছে তেতো লাগছিল। তার গাল এখনও ফুলে আছে। অরিন্দমের চোখ দুটোও সে ভুলতে পারছে না। সেই চোখে ভয় ছিল না।ঘৃণাও ছিল না। ছিল বিচার চাওয়ার সাহস। আর সেই ভয় হীন চোখ তাকে সবচেয়ে বেশি অস্থির করে তুলেছিল।
দুপুরবেলা সে ডেকে পাঠাল নিত্যানন্দ পালকে। লোকটা তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী। চেহারায় ভদ্রতার মুখোশ থাকলেও ভিতরে ভিতরে ছিল বিষধর সাপের মতো। নিত্যানন্দ এসে চুপচাপ বসতেই মহাদেব বলল,
—ও ছেলেটাকে বাঁচিয়ে রাখা ঠিক হবে?
নিত্যানন্দ উত্তর দিল না। শুধু ধীরে ধীরে হুঁকোর ধোঁয়া ছাড়ল।
—চুপ করে আছ কেন?
—কারণ রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বেশি ক্ষতি করে।
—তুমি কি ভয় পেয়েছ?
—আমি না। কিন্তু আপনাকে ভয় পাওয়া উচিত।
মহাদেব কুঁচকে গেল। — মানে?
—গ্রামের মানুষ আপনাকে মানে না। সহ্য করে। দুটো আলাদা জিনিস।
—তো তাতে কি হয়েছে ?
—অরিন্দমকে সবাই ভালোবাসে।
মহাদেব অস্থীর হয়ে টেবিলে ঘুষি মারল।
—তাহলে কি ওর কাছে হার মেনে নেব?
নিত্যানন্দ এবার ঠান্ডা গলায় বলল,
—হার নয়। অপেক্ষা। অন্ধকারে যে শিকার করে, সে কখনও তাড়াহুড়ো করে না।
ঘরের ভেতর কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল। বাইরে তখন কালো মেঘ জমছে। হঠাৎ দূরে বাজ পড়ল। মহাদেব জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, যেন শালবনের দিক থেকে কেউ তাকিয়ে আছে। কেউ একজন। অদৃশ্য। অপেক্ষমাণ।
এদিকে অরিন্দম এসব নিয়ে খুব একটা ভাবছিল না। তার কাছে বিষয়টা ছিল সোজা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, যে মানুষ সারাজীবন মানুষের কান্না খেয়ে বড় হয়েছে, সে এত সহজে অপমান ভুলবে না।সন্ধ্যায় পাঁচ বন্ধু আবার মহাপ্রভুর মন্দিরের সামনে বসেছিল। আকাশে তখন পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। শালবনের কালো মাথার উপর রুপালি আলো পড়ছে।
হঠাৎ দেবু বলল, —তোদের কখনও মনে হয়, জঙ্গলের ভেতর কেউ থাকে?
রাজু হেসে উঠল। —ভূত?
—হয়তো।
—ছাড় তো!
কিন্তু অরিন্দম চুপ করে রইল। কারণ গত কয়েকদিন ধরে তারও অদ্ভুত কিছু অনুভূতি হচ্ছিল। রাতের দিকে বাড়ি ফেরার সময় বারবার মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে। পেছনে তাকালেই কিছু নেই। কিন্তু উপস্থিতির অনুভূতি রয়ে যায়।
বিকাশ মজা করে বলল, —ভূত যদি থাকেও, আমাদের দেখে পালাবে।
সবাই হেসে উঠল।
শুধু অরিন্দম হাসল না। কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে তার কানে এল—
খুব দূর থেকে ভেসে আসা একটা শব্দ। যেন কেউ কান্না করছে। মৃদু। দীর্ঘ।অস্বাভাবিক।
শব্দটা এল শালবনের গভীর দিক থেকে।
পাঁচজনই চুপ করে গেল। তারপর শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল।
দেবু ফিসফিস করে বলল, —শুনলি?
অরিন্দম ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ তখন অন্ধকার জঙ্গলের দিকে।সেখানে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু কেন জানি তার মনে হলো— শালবনের ভেতরে কিছু একটা জেগে উঠেছে।
এবং সেই জেগে ওঠা জিনিসটার সঙ্গে খুব শিগগিরই তাদের দেখা হবে।
__________________________________________________________
তৃতীয় অধ্যায়: শালবনের কান্না
শালবনিয়ার পশ্চিম প্রান্তে যে জঙ্গলটা ছিল, তাকে গ্রামের মানুষ শুধু “শালবন” বলত না। বৃদ্ধরা তাকে বলত—”নিষিদ্ধ বন”। দিনের বেলায় সেখানে গরু চরত, কাঠুরেরা শুকনো ডাল কুড়িয়ে আনত, ছেলেপুলেরা শালবীজ কুড়িয়ে খেলত। কিন্তু সূর্য ডোবার পর গ্রামের কেউ সেই বনের দিকে পা বাড়াত না।
কারণ একটা পুরনো গল্প ছিল। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে নাকি এক মহামারিতে গ্রামের বহু মানুষ মারা গিয়েছিল। মৃতদেহ পোড়ানোর মতো কাঠও ছিল না। অনেককে ওই জঙ্গলের ধারে গণকবরে কবর দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকেই নাকি মাঝে মাঝে রাতের অন্ধকারে কান্নার শব্দ শোনা যায়। কেউ বলে বাতাসের শব্দ।কেউ বলে শিয়ালের ডাক। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করে, ওগুলো মৃত মানুষের আর্তনাদ।
অরিন্দম এসব গল্পে বিশেষ বিশ্বাস করত না। কিন্তু সেদিন রাতে বিছানায় শুয়েও সেই কান্নার শব্দটা তার কানে বারবার ফিরে আসছিল। ঘুম আসছিল না। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। হাওয়ায় জানলার পাল্লা কাঁপছে।
হঠাৎ তার মনে হলো, যেন উঠোনে কেউ হাঁটছে। খুব ধীরে। খস… খস… খস…
শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটার মতো শব্দ। অরিন্দম উঠে বসে জানলার দিকে তাকাল। অন্ধকার। শুধু বৃষ্টির রেখা। আর কিছু নয়। তবুও তার বুকের ভেতর একটা অজানা অস্বস্তি জমে রইল।
পরদিন সকালে হাটবার। শালবনিয়ার হাটে ভিড় উপচে পড়েছে। চাষি, ব্যবসায়ী, মাঝি, কামার, কুমোর—সবার ভিড়।
অরিন্দম ও তার বন্ধুরা হাটের চায়ের দোকানে বসে গল্প করছিল। ঠিক তখনই ছুটে এল এক কিশোর। হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলল,
—অরিন্দমদা! অরিন্দমদা! বনের ধারে একটা লোক পড়ে আছে!
—কোথায়?
—পুরনো শ্মশানের কাছে!
কথা শেষ হওয়ার আগেই সবাই উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল জায়গাটায়। শালবনের ধারে একটা পুরনো বটগাছ। তার নীচে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে একজন মানুষ। লোকটাকে উল্টে দিতেই সবাই চমকে উঠল। সে মহাদেব সাহার হিসাবরক্ষক নকুল। চোখ দুটো বিস্ফারিত। মুখে জমাট ভয়ের ছাপ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—
তার শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই। কোনও রক্ত নেই। কোনও অস্ত্র নেই।তবু লোকটা মৃত।
দেবু ফিসফিস করে বলল, —এ যেন ভয় পেয়ে মারা গেছে!
অরিন্দম কিছু বলল না।
সে মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার চোখ গিয়ে পড়ল ভেজা মাটির ওপর। সেখানে অদ্ভুত কিছু চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মানুষের পায়ের ছাপ নয়। পশুরও নয়। যেন কেউ খালি হাড়ের পা নিয়ে কাদার ওপর হেঁটেছে। লম্বা। সরু।অস্বাভাবিক।
বিকাশ কাঁপা গলায় বলল, —ওগুলো কী?
অরিন্দম উত্তর দিতে পারল না। কারণ জীবনে সে এমন ছাপ কখনও দেখেনি।
সন্ধ্যার আগেই খবর পৌঁছে গেল মহাদেব সাহার কাছে। নকুল তার বহুদিনের বিশ্বস্ত লোক। খবর শুনে মহাদেব প্রথমবারের মতো সত্যিকারের ভয় পেল।
কারণ গত কয়েকদিন ধরে নকুলও তাকে একটা কথা বারবার বলছিল। সে নাকি রাতে কারও ছায়া দেখতে পায়। কেউ তাকে অনুসরণ করে। কিন্তু কাছে গেলেই মিলিয়ে যায়। মহাদেব তখন এসব কথা শুনে হেসেছিল। আজ আর হাসতে পারল না।
রাত নামার পর সে নিজের ঘরের সব জানালা বন্ধ করে দিল। দরজায় অতিরিক্ত খিল লাগাল। তবুও অস্বস্তি কাটল না। বাইরে তখন ঝড় উঠেছে। শালবনের দিক থেকে হাওয়া ছুটে আসছে। হঠাৎ…ঠক! ঠক! ঠক!
জানলার গায়ে কে যেন আঘাত করল। মহাদেব চমকে উঠল। ওইএ ! তারপর আবার। ঠক! ঠক! ঠক!
সে কাঁপতে কাঁপতে জানলার কাছে এগিয়ে গেল। বাইরে কেউ নেই। শুধু অন্ধকার। আর বৃষ্টির রেখা। কিন্তু ঠিক তখনই বিদ্যুতের ঝলকানিতে এক মুহূর্তের জন্য সে যা দেখল, তা তার বুকের রক্ত হিম করে দিল। জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ। সারা শরীর কাদায় মাখা। মাথা নিচু। মুখ দেখা যাচ্ছে না।পরের মুহূর্তেই অন্ধকার। লোকটাও নেই। মহাদেব পিছিয়ে এল। তার হাত কাঁপছে। কপাল ঘামে ভিজে গেছে। সে জানত না— এটা কি তার কল্পনা। নাকি সত্যিই কেউ তাকে দেখতে এসেছে।
সেই রাত থেকেই শালবনিয়ার ওপর নেমে এল এক অদৃশ্য আতঙ্ক।
__________________________________________________________
চতুর্থ অধ্যায়: অন্ধকারের সাক্ষী
নকুলের মৃত্যুর পর থেকে শালবনিয়ার পরিবেশ যেন বদলে গেল। আগে সন্ধ্যা নামলে গ্রামের চায়ের দোকানগুলোতে আড্ডা চলত রাত পর্যন্ত। এখন সূর্য ডুবলেই মানুষজন দ্রুত বাড়ি ফিরতে শুরু করল। দোকানের ঝাঁপ পড়ে যেত আগেভাগেই। রাতের শালবনিয়া যেন আর আগের শালবনিয়া নয়। একটা চাপা আতঙ্ক গ্রামটাকে ঘিরে ধরেছে।
নকুলের মৃত্যুর তদন্তে থানার দারোগা অমিয় সেন এলেন। তিনি কুসংস্কারে বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন না। মৃতদেহ পরীক্ষা করে, ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে তিনি শুধু একটা কথাই বললেন— “যে-ই হোক, সে খুব বুদ্ধিমান।”
কিন্তু ভিতরে ভিতরে তিনিও অস্বস্তি বোধ করছিলেন। কারণ মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা যাচ্ছে না।
ডাক্তার বললেন, নকুলের হৃদযন্ত্র হঠাৎ বিকল হয়ে গেছে।
কিন্তু কেন? কিসের ভয়ে? তার উত্তর কারও কাছে নেই।
সেই রাতেই আরেকটি ঘটনা ঘটল। গ্রামের প্রাচীনতম মানুষ, নব্বই বছরের বৃদ্ধ গদাই কাকা, হঠাৎ গভীর রাতে বাড়ির উঠোনে চিৎকার করে উঠলেন। তার ছেলে-মেয়েরা ছুটে এসে দেখল, বৃদ্ধ কাঁপছেন। চোখদুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে আছে।
—কি হয়েছে?
বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন, —আমি দেখেছি…
—কাকে?
—ওকে…
—কাকে?
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, —শালবনের মানুষটাকে…
ঘরে উপস্থিত সবাই চুপ। বৃদ্ধ বললেন,
—সে জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। পুরো শরীর কাদা আর শুকনো পাতায় ঢাকা। তার চোখ দুটো জ্বলছিল আগুনের মতো।
—তারপর?
—সে আমাকে একটা কথা বলেছে…
—কি কথা?
বৃদ্ধের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
—সে বলেছে, “বিচার শুরু হয়েছে।”
ঘরে তখন এমন নীরবতা নেমে এল, যেন সবাই একসঙ্গে শ্বাস নিতে ভুলে গেছে।
পরদিন সকালে খবরটা পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। মানুষের মুখে মুখে নতুন গল্প জন্ম নিতে লাগল। কেউ বলল, বনদেবতার অভিশাপ। কেউ বলল, পুরনো মৃতদের আত্মা জেগে উঠেছে। আবার কেউ বলল, কোনও মানুষই এসব করছে। অরিন্দম এসব গল্প শুনে বিরক্ত হয়ে উঠছিল। সে বিশ্বাস করত, প্রতিটি ঘটনার পিছনে কোনও না কোনও বাস্তব কারণ থাকে। তবুও একটা বিষয় তাকে ভাবিয়ে তুলছিল। সেই অদ্ভুত পায়ের ছাপ। যেটা তারা নকুলের মৃতদেহের পাশে দেখেছিল। সেই ছাপের রহস্য এখনও অমীমাংসিত।
বিকেলে অরিন্দম একাই শালবনের দিকে বেরিয়ে পড়ল। বনের ভেতরে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরল। বাইরে প্রচণ্ড গরম। কিন্তু বনের ভিতর যেন অন্য এক জগৎ। বাতাস স্থির। পাখির ডাক নেই। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ নেই। অস্বাভাবিক নীরবতা। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটা পুরনো পাথরের বেদি। ঝোপঝাড়ে ঢাকা। মনে হয় বহু বছর কেউ এখানে আসেনি। বেদির গায়ে শ্যাওলা জমেছে। তবু কিছু খোদাই এখনও স্পষ্ট। অরিন্দম হাত দিয়ে ময়লা সরিয়ে পড়ার চেষ্টা করল। সেখানে লেখা— “এখানে যারা ঘুমিয়ে আছে, তাদের শান্তি ভঙ্গ করো না।”
অরিন্দমের বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। ঠিক তখনই তার পিছনে একটা শব্দ হলো।
খস… খস… খস…
সে ঘুরে দাঁড়াল। কেউ নেই। শুধু গাছ। আর ছায়া। কিন্তু সে স্পষ্ট অনুভব করল—
কেউ তাকে দেখছে। এক জোড়া অদৃশ্য চোখ। খুব কাছে। খুব মনোযোগ দিয়ে।
এদিকে সেই সময় মহাদেব সাহা নিজের ঘরে বসে ছিল। গত কয়েকদিনে তার চেহারা বদলে গেছে। চোখের নীচে কালি। মুখ শুকনো। রাতে ঘুম হয় না। সামান্য শব্দেও চমকে ওঠে।
নিত্যানন্দ এসে বলল, —এভাবে চললে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন।
মহাদেব নিচু গলায় বলল, —তুই বুঝবি না।
—কি বুঝব না?
মহাদেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ফিসফিস করে বলল, —আমি প্রতি রাতে একই স্বপ্ন দেখি।
—কিসের?
—একটা লোক দাঁড়িয়ে থাকে বটগাছের নীচে।
—কে সে?
মহাদেব উত্তর দিল না। তার কপালে ঘাম জমল। কারণ সে জানে, স্বপ্নের সেই মুখটা সে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে। আর সেই কারণেই তার ভয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
সেই রাতেই ঝড় উঠল। ভয়ংকর ঝড়। বজ্রপাতের আলোয় বারবার কেঁপে উঠতে লাগল শালবন। আর ঠিক মধ্যরাতে—
মহাদেব সাহার বাড়ির পেছনের উঠোনে কে যেন ধীরে ধীরে হেঁটে গেল। ভেজা মাটিতে পড়ে রইল কিছু অদ্ভুত চিহ্ন। সকালে লোকজন এসে দেখল—
সেগুলো মানুষের পায়ের ছাপ নয়। বরং যেন কোনও কঙ্কাল খালি হাড় নিয়ে হেঁটে গেছে। আর সেই ছাপগুলো সোজা গিয়ে শেষ হয়েছে মহাদেব সাহার শোবার ঘরের জানলার নীচে। শালবনিয়ার মানুষের বুকের ভিতর তখন একটাই প্রশ্ন—
কে ফিরে এসেছে?
আর কেন?
পঞ্চম অধ্যায়: রক্তঋণের ইতিহাস
পরদিন সকাল থেকেই শালবনিয়া গ্রামে আর কোনও আলোচনা নেই। সবাই শুধু একটাই কথা বলছে। মহাদেব সাহার বাড়ির পিছনের সেই অদ্ভুত পায়ের ছাপ।লোকজন দল বেঁধে এসে দেখেছে। কেউ মেপে দেখেছে। কেউ লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে দেখেছে। কিন্তু যতই দেখা হোক, রহস্যের কোনও সমাধান মেলেনি।ছাপগুলো মানুষের পায়ের মতো নয়। আবার কোনও পশুরও নয়। যেন শুকনো হাড়ের সরু আঙুল মাটির ওপর চাপ দিয়ে এগিয়ে গেছে।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো—ছাপগুলো শুধু এসেছিল। ফিরে যাওয়ার কোনও ছাপ নেই। যেন অদৃশ্য কোনও কিছু হঠাৎ সেখানে এসে দাঁড়িয়েছিল। তারপর বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
সেই দিন বিকেলে অরিন্দম আবার দেখা করতে গেল বৃদ্ধ গদাই কাকার সঙ্গে।
গদাই কাকা শালবনিয়ার জীবন্ত ইতিহাস। অনেক ঘটনা তাঁর জানা। অরিন্দমের মনে হচ্ছিল, এই রহস্যের উত্তর হয়তো অতীতের কোথাও লুকিয়ে আছে। বৃদ্ধ তখন বারান্দায় বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন। অরিন্দম গিয়ে বসতেই তিনি বললেন—
—তুই উত্তর খুঁজতে এসেছিস?
অরিন্দম অবাক হলো। —আপনি জানলেন কী করে?
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন —তোর চোখ বলছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি দূরের শালবনের দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
—আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে এই গ্রামে আরেকজন মহাদেব ছিল।
—মানে?
—মহাদেব সাহা তখন যুবক। তার বাবা হরিবল্লভ সাহা ছিল গ্রামের মহাজন।
অরিন্দম মন দিয়ে শুনতে লাগল।
—লোকটা ছিল ভয়ংকর লোভী। মানুষের জমি কেড়ে নিত, মিথ্যা দলিল করত, গরিবদের পথে বসিয়ে দিত।
—তারপর?
—একদিন একজন কৃষক প্রতিবাদ করেছিল।
—কে?
বৃদ্ধের মুখ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল।
—রঘুনাথ মণ্ডল।
নামটা উচ্চারণ করতেই যেন চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
—রঘুনাথ ছিল খুব সৎ মানুষ। কিন্তু এক বছর খরার সময় সে ঋণ নিয়েছিল। পরে টাকা শোধ করলেও হরিবল্লভ তার জমি ফেরত দেয়নি।
—তারপর?
—রঘুনাথ প্রতিবাদ করেছিল।
—তার কী হয়েছিল?
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—এক রাতে সে নিখোঁজ হয়ে যায়।
অরিন্দমের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
—কেউ খুঁজল না?
—অনেক খোঁজা হয়েছিল। কিন্তু তাকে আর পাওয়া যায়নি।
—তাহলে?
—কয়েক মাস পরে শালবনের ভেতরে তার কঙ্কাল পাওয়া যায়।
অরিন্দম স্তব্ধ হয়ে গেল। বৃদ্ধের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।
—লোকজন বলত, তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
—প্রমাণ?
—কোনও প্রমাণ ছিল না।
—সন্দেহ?
—সবাই হরিবল্লভ সাহাকে সন্দেহ করত।
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
—তাহলে কি আজকের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সেই ঘটনার সম্পর্ক আছে?
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। শুধু শালবনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় অরিন্দম যখন বাড়ি ফিরছিল, তখন আকাশে কালো মেঘ জমেছে।
শালবনের পাশের পথ ধরে যেতে যেতে হঠাৎ সে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখল।
দূরে, গাছের ফাঁকে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একজন মানুষ। স্থির। নিঃশব্দ। অরিন্দম থেমে গেল। লোকটাও নড়ল না। বাতাসে তার পোশাকের একটা অংশ দুলে উঠল। মনে হলো যেন বহু পুরনো, ছেঁড়া ধুতি।
অরিন্দম ডাকল —কে?
কোনও উত্তর নেই।
সে আরও কয়েক কদম এগোল। আর ঠিক তখনই বিদ্যুতের ঝলকানি হলো। এক মুহূর্তের জন্য মুখটা দেখা গেল। আর সেই মুখ দেখে তার বুকের রক্ত যেন জমে গেল। মুখটা মানুষের। কিন্তু স্বাভাবিক নয়। চোখদুটো গভীর কালো গর্তের মতো।গাল বসে গেছে। ঠোঁট নেই। মুখে অদ্ভুত এক বেদনার ছাপ। পরের মুহূর্তে আবার অন্ধকার। আর লোকটাও নেই।
সেই রাতেই মহাদেব সাহা প্রথমবার নিজের ঘরে একা থাকতে ভয় পেল। সে নিত্যানন্দকে বাড়িতে থেকে যেতে বলল। নিত্যানন্দ অবাক হলেও রাজি হলো।রাত বাড়তে লাগল। বাইরে বৃষ্টি। দূরে শিয়ালের ডাক। ঘরের ভেতর মৃদু আলো।হঠাৎ.. টুপ… টুপ… টুপ… একটা শব্দ।
যেন কোথাও জল পড়ছে। নিত্যানন্দ উঠে দাঁড়াল। —কোথা থেকে আওয়াজটা আসছে?
মহাদেব কিছু বলল না। তার চোখ দরজার দিকে। শব্দটা আবার হলো।
টুপ… টুপ… টুপ…
এবার মনে হলো, শব্দটা ঘরের ভেতর থেকেই আসছে। দুজনেই চারদিকে তাকাল। তারপর নিত্যানন্দের চোখ হঠাৎ উপরের দিকে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ সাদা হয়ে গেল।
—ওই… ওইটা কী?
মহাদেব তাকাল। তারপর একটা চাপা চিৎকার বেরিয়ে এল তার গলা থেকে।
ছাদের মাঝখানে একটা কালচে দাগ। সেখান থেকে টপটপ করে পড়ছে লাল রঙের তরল। রক্তের মতো।
নিত্যানন্দ কাঁপা হাতে লণ্ঠন তুলে ধরল। কিন্তু ঠিক তখনই প্রবল বাতাসে আলো নিভে গেল। ঘর ডুবে গেল অন্ধকারে। আর সেই অন্ধকারের গভীর থেকে ভেসে এল একটা কণ্ঠস্বর।
খুব ধীর। খুব ঠান্ডা। “ঋণ শোধের সময় হয়েছে…”
মহাদেব আর নিত্যানন্দ দুজনেই জমে গেল। কারণ ঘরে তারা ছাড়া আর কেউ থাকার কথা নয়। তবুও সেই কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শোনা গেল।
আর তারপর—অন্ধকারে যেন কেউ হাসল। একটা দীর্ঘ, শীতল, অমানুষিক হাসি।যে হাসি শুনে মানুষের শরীরের রক্ত পর্যন্ত ঠান্ডা হয়ে যায়।
ষষ্ঠ অধ্যায়: শালবনের নীচে চাপা সত্য
সকালে ঘুম ভাঙার পর মহাদেব সাহা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না যে রাতের ঘটনাগুলো সত্যি ছিল। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—সবই হয়তো কল্পনা।ভয় থেকে জন্ম নেওয়া বিভ্রম।
কিন্তু ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যখন সে ছাদের দিকে তাকাল, তখন তার বুকের ভেতরটা আবার ঠান্ডা হয়ে গেল। কালো দাগটা এখনও আছে। আর মেঝেতে ছড়িয়ে আছে শুকিয়ে যাওয়া লালচে দাগ। নিত্যানন্দও সেগুলো দেখল। কিন্তু কাউকেই কিছু বলল না। দুজনেই বুঝতে পারছিল, বিষয়টা আর সাধারণ নেই।
অন্যদিকে অরিন্দমের মাথা থেকে আগের দিনের ঘটনাটা সরছিল না। শালবনের ভেতরে সে যা দেখেছে, সেটা কি সত্যিই মানুষ ছিল? নাকি চোখের ভুল? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সে আবার বেরিয়ে পড়ল। এইবার সঙ্গে ছিল বিকাশ, রাজু, সুমন আর দেবু। দুপুরের রোদ মাথার উপর। তবু জঙ্গলের ভিতরে ঢুকতেই যেন আলো কমে গেল। গাছের মাথাগুলো এত ঘন হয়ে আছে যে সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। বাতাসে একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। পচা পাতা, ভেজা মাটি আর বহুদিনের পুরনো কিছুর গন্ধ। চারজন বন্ধু যতই হাসি-ঠাট্টা করার চেষ্টা করুক, সবার মনেই একটা চাপা অস্বস্তি।
দেবু বলল, —গুরু, ঠিক কোথায় দেখেছিলি?
অরিন্দম হাত তুলে দেখাল —ওইদিকে।
সবাই এগিয়ে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ বিকাশ থেমে গেল।
—ওটা কী?
সামনে একটা উঁচু ঢিবির মতো জায়গা। ঝোপে ঢাকা। কিন্তু কাছ থেকে দেখে বোঝা গেল, এটা প্রাকৃতিক নয়। কেউ যেন অনেক বছর আগে মাটি ফেলে একটা জায়গা উঁচু করে রেখেছিল। অরিন্দমের মনে অদ্ভুত একটা কৌতূহল জাগল।
সে একটা শুকনো ডাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করল। ই দু-তিন মিনিটের মধ্যেই ডালটা শক্ত কিছুতে ঠেকল।
সবাই মিলে মাটি সরাতে লাগল। আর তারপর…
হঠাৎ সুমন চিৎকার করে উঠল। মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা মানুষের হাতের হাড়। সবাই কয়েক মুহূর্ত নিথর। শালবনের বাতাস যেন আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল।
খবর পেয়ে পুলিশ এল। দারোগা অমিয় সেন নিজে উপস্থিত হলেন। খনন শুরু হলো। ঘণ্টাখানেক পর যা বেরিয়ে এল, তা দেখে উপস্থিত সবাই স্তম্ভিত। একটা নয়। দুটো নয়। মোট পাঁচটি কঙ্কাল। সবগুলো পাশাপাশি চাপা দেওয়া। আর প্রত্যেকটির মাথার খুলিতে আঘাতের চিহ্ন। দারোগা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বললেন, —এগুলো দুর্ঘটনা নয়। এগুলো হত্যা।
শব্দটা শুনে চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। শালবনিয়া যেন হঠাৎ আরও অন্ধকার হয়ে উঠল।
সেই সন্ধ্যায় দারোগা অমিয় সেন পুরনো নথিপত্র ঘাঁটতে শুরু করলেন। থানার ধুলোমাখা রেকর্ডে তিনি একটা আশ্চর্য তথ্য পেলেন। গত ত্রিশ বছরে শালবনিয়া গ্রাম থেকে মোট পাঁচজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল রঘুনাথ মণ্ডল। বাকিরাও ছিল গরিব কৃষক। আর একটা বিষয় অবিশ্বাস্যভাবে মিলছিল। পাঁচজনেরই জমি বা সম্পত্তি নিয়ে কোনও না কোনও সময়ে বিরোধ হয়েছিল হরিবল্লভ সাহার সঙ্গে। অমিয় সেন ফাইল বন্ধ করে চুপ করে বসে রইলেন। তার সামনে যেন একটা চিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কিন্তু এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণটা নেই।
সেদিন রাতে মহাদেব সাহা এক ফোঁটাও ঘুমোতে পারল না। তার বাবার নাম বারবার কানে বাজতে লাগল। হরিবল্লভ সাহা। সে জানত, তার বাবা ভালো মানুষ ছিলেন না। কিন্তু এতটা? পাঁচটা খুন? না, এটা সে বিশ্বাস করতে চাইছিল না।
রাত প্রায় বারোটা। হঠাৎ বাড়ির পুরনো দালানের দিক থেকে একটা শব্দ এল।খটাং। খটাং। খটাং। যেন কেউ ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
মহাদেব প্রথমে উপেক্ষা করল। কিন্তু শব্দটা ক্রমশ কাছে আসতে লাগল।
খটাং… খটাং… খটাং…
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে গেল। অবশেষে সে একটা লণ্ঠন নিয়ে বেরোল। বাড়ির পিছনের পুরনো গুদামঘরের সামনে এসে দাঁড়াতেই শব্দটা থেমে গেল। চারদিক নিস্তব্ধ। কেবল বাতাস। আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই লণ্ঠনের আলো পড়ল গুদামের দরজায়।আর সঙ্গে সঙ্গে তার হাত থেকে লণ্ঠনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। দরজার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা—“পাঁচজনের হিসাব বাকি।”
লেখাটা লাল রঙে। দেখতে রক্তের মতো। মহাদেব কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তার পা কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। আর তখনই গুদামের ভেতর থেকে ভেসে এল একটা শব্দ।
মৃদু। কিন্তু স্পষ্ট। যেন অনেকগুলো মানুষ একসঙ্গে ফিসফিস করে বলছে—“আমাদের কথা মনে আছে?”
মহাদেব আর দাঁড়াতে পারল না।সে দৌড়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। কিন্তু সেই রাতের পর প্রথমবার তার মনে হলো— হয়তো কেউ ফিরে এসেছে। কোনও প্রেত নয়। কোনও কল্পনা নয়। বরং এমন এক সত্য, যাকে এতদিন মাটির নীচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল।
আর সেই সত্য এখন কবর ভেঙে উঠে আসছে বিচার চাইতে।
সপ্তম অধ্যায়: শেষ সাক্ষী
শালবনিয়ার মানুষ বহু বছর পরে প্রথমবার দেখল মহাদেব সাহাকে ভয় পেতে। যে লোক একসময় গ্রামের দরিদ্র মানুষদের সামনে বুক ফুলিয়ে হাঁটত, আজ সে দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরের ভেতরে বসে থাকে। সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়ির ফটক বন্ধ হয়ে যায়। রাতে চারদিকে লণ্ঠন জ্বালানো হয়। দুজন পাহারাদার রাখা হয়েছে। তবু মহাদেবের আতঙ্ক কমছে না। কারণ সে বুঝতে পারছে, শত্রু যদি মানুষ হয়, তাকে ঠেকানো যায়। কিন্তু অদৃশ্য কিছুকে কীভাবে ঠেকাবে?
এদিকে দারোগা অমিয় সেন তদন্তে এক নতুন সূত্র পেলেন। পুরনো নথি ঘাঁটতে ঘাঁটতে তিনি জানতে পারলেন, হরিবল্লভ সাহার সময়ে একজন কর্মচারী ছিল—হরেকৃষ্ণ। লোকটা ছিল হিসাবরক্ষক। সব লেনদেন, জমির দলিল, ঋণের খাতা—সব তার হাত দিয়েই চলত। কিন্তু হঠাৎ একদিন সে চাকরি ছেড়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। তারপর আর কেউ তার খোঁজ পায়নি। অমিয় সেনের সন্দেহ হলো। অনেক কষ্টে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, লোকটা এখনও বেঁচে আছে। জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে তার বসবাস। বয়স এখন প্রায় আশি। পরদিনই অমিয় সেন সেখানে রওনা হলেন।
বৃদ্ধ হরেকৃষ্ণকে দেখে মনে হলো, জীবনের ভারে তিনি প্রায় নুয়ে পড়েছেন। চোখে মোটা চশমা। মুখে গভীর ভাঁজ। দারোগা যখন শালবনিয়ার কথা তুললেন, তখন বৃদ্ধের মুখের রঙ পাল্টে গেল। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিনি বললেন —এত বছর পরে আবার সেই নাম!
—আপনি কিছু জানেন?
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—জানি।
—তাহলে বলুন।
বৃদ্ধের চোখে জল এসে গেল।
—সারা জীবন ওই পাপের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। তারপর তিনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
ত্রিশ বছর আগে এক বর্ষার রাতে হরিবল্লভ সাহা তার কয়েকজন বিশ্বস্ত লোককে নিয়ে বেরিয়েছিল। হরেকৃষ্ণ তখনও তরুণ। সেই রাতে তাকে জোর করে সঙ্গে নেওয়া হয়। তারা শালবনের ভেতরে গিয়েছিল। সেখানে বাঁধা অবস্থায় ছিল পাঁচজন কৃষক। তাদের একজন ছিল রঘুনাথ মণ্ডল। তারা কাঁদছিল। প্রাণভিক্ষা চাইছিল। কিন্তু হরিবল্লভের মন গলেনি। কারণ তারা জমি ফেরত চাইতে সাহস করেছিল।
হরেকৃষ্ণ কাঁপা গলায় বললেন —আমি সব দেখেছিলাম।
অমিয় সেন নিঃশ্বাস আটকে শুনছিলেন।
—তারপর?
বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।
—ওদের মাথায় লাঠি মারা হয়। একজন একজন করে।
সেই রাতেই। তারপর কবর দেওয়া হয় শালবনের মাটির নীচে।
অমিয় সেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
—আপনি কাউকে বলেননি?
—ভয় পেয়েছিলাম।
—আর এখন?
—এখন মৃত্যুর আগে সত্যিটা বলে যেতে চাই।
সেই দিন সন্ধ্যার মধ্যে অমিয় সেন শালবনিয়ায় ফিরে এলেন। তার হাতে এখন একটা বড় সত্য। কিন্তু এখনও একটা প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। নকুলের মৃত্যু। অদ্ভুত পায়ের ছাপ। মহাদেবের বাড়ির ঘটনাগুলো। এসবের সঙ্গে পুরনো হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক কী?
সেই রাতেই ঘটল আরও ভয়ংকর ঘটনা। মহাদেব সাহা তার ঘরে বসে ছিল।
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। সারা বাড়ি অন্ধকারে ডুবে গেল। পাহারাদারদের ডাকতে গিয়ে সে দেখল, বাইরে কোনও সাড়া নেই। অস্বাভাবিক নীরবতা। একসময় সে একটা লণ্ঠন জ্বালাল। কম্পমান আলোয় ঘরটা যেন আরও ভয়ংকর লাগছিল।
ঠিক তখনই—
টক… টক… টক… দরজায় শব্দ হলো। মহাদেব থমকে গেল —কে?
কোনও উত্তর নেই।
আবার—
টক… টক… টক… এইবার শব্দটা যেন দরজায় নয়। ঘরের ভেতরেই। তার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো। ধীরে ধীরে সে লণ্ঠন উঁচু করল। আর তখনই তার চোখ পড়ল ঘরের কোণের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ। না… মানুষ নয়।একটা শুকনো, কঙ্কালসার অবয়ব। গায়ে ছেঁড়া ধুতি। চোখের জায়গায় গভীর অন্ধকার। তবু মনে হচ্ছে, সে তাকিয়ে আছে। সোজা মহাদেবের দিকে। মহাদেবের মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না।
কঙ্কালসার অবয়বটি ধীরে ধীরে হাত তুলল। আর একটা দিকে ইশারা করল।দেয়ালের দিকে। মহাদেব কাঁপতে কাঁপতে তাকাল। দেয়ালে তখন একের পর এক ভেজা হাতের ছাপ ফুটে উঠছে। একটা। দুটো। তিনটে। চারটে। পাঁচটা। যেন অদৃশ্য কেউ রক্তমাখা হাত দিয়ে দেয়াল ছুঁয়ে যাচ্ছে।
মহাদেব হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার শরীর কাঁপছে
ঠিক সেই সময়, গ্রামের অন্য প্রান্তে নিজের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল অরিন্দম। দূরে শালবনের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ সে দেখল— জঙ্গলের গভীর থেকে যেন এক মুহূর্তের জন্য নীলচে আলো জ্বলে উঠল। তারপর নিভে গেল।কিন্তু সেই এক মুহূর্তেই তার মনে হলো— কেউ একজন তাকে ডাকছে।
অষ্টম অধ্যায়: ষষ্ঠ কবর
পরদিন ভোর থেকেই আকাশ ভারী। সূর্যের দেখা নেই। মেঘের চাদরে ঢাকা পড়ে আছে গোটা শালবনিয়া।
রাতের ঘটনার পর মহাদেব সাহার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। চোখ লাল, মুখ বিবর্ণ, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। বাড়ির চাকর-বাকরেরা পর্যন্ত ফিসফিস করে বলতে শুরু করেছে—”বড়বাবুর উপর কিছু একটা নেমেছে।”
কিন্তু মহাদেব এখনও কাউকে সত্যিটা বলার সাহস পেল না। কারণ সে জানে, সত্যি বললে প্রথমেই আঙুল উঠবে তার নিজের পরিবারের দিকে।
সকালে দারোগা অমিয় সেন অরিন্দমকে ডেকে পাঠালেন। থানার ছোট্ট ঘরে বসে তিনি সব কথা খুলে বললেন। হরেকৃষ্ণের জবানবন্দি। পাঁচজন কৃষকের হত্যাকাণ্ড। শালবনের কবর। সবকিছু। অরিন্দম চুপচাপ শুনল। তারপর বলল,
—তাহলে খুনিদের নাম প্রায় নিশ্চিত?
—প্রায়।
—তাহলে গ্রেপ্তার করছেন না কেন?
অমিয় সেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের অধিকাংশই বহু বছর আগে মারা গেছে।
—আর মহাদেব?
—সে সরাসরি জড়িত ছিল কি না, এখনও প্রমাণ পাইনি।
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—কিন্তু ঘটনাটা এখানেই শেষ নয়।
—মানে?
—আমার মনে হচ্ছে, শালবনের নিচে শুধু পাঁচজন নেই।
অমিয় সেন তাকালেন।
—কেন এমন মনে হচ্ছে?
অরিন্দম উত্তর দিল না। কারণ তার নিজেরও কোনও প্রমাণ নেই। শুধু এক অদ্ভুত অনুভূতি। যেন কেউ তাকে কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে।
সেদিন বিকেলে তারা আবার গেল শালবনে। সঙ্গে কয়েকজন পুলিশও ছিল।আকাশে তখন মেঘ জমেছে। বনের ভেতর ঢুকতেই যেন আলো আরও কমে গেল। গাছের ডালগুলো বাতাসে দুলছে। দূরে কোথাও কাক ডাকছে। হঠাৎ অরিন্দম থেমে গেল। তার মনে হলো, কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকল। খুব আস্তে। –“অরিন্দম…”
সে চারদিকে তাকাল। কেউ নেই।
আবার— “অরিন্দম…”
এবার শব্দটা যেন বনের আরও গভীর থেকে এল। অমিয় সেন বললেন, —কি হলো?
অরিন্দম ধীরে বলল, —আমার সঙ্গে আসুন।
সে নিজেও জানত না কেন ওইদিকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, অদৃশ্য কোনও শক্তি তাকে পথ দেখাচ্ছে। একসময় তারা পৌঁছাল বনের এমন এক জায়গায়, যেখানে আগে কেউ আসেনি। ঝোপঝাড়ে ঢাকা। ভাঙা পাথরের স্তূপ। আর তার মাঝখানে একটা বিশাল পুরনো বটগাছ। গাছটার গুঁড়ি এত মোটা যে চারজন মানুষ হাত ধরে ঘিরলেও শেষ হবে না। হঠাৎ অরিন্দম গাছটার একপাশে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, —এখানে খুঁড়ুন।
পুলিশরা অবাক।
—এখানে কেন?
—জানি না।
—তাহলে?
—তবু খুঁড়ুন।
অমিয় সেন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
—শুরু করুন।
প্রায় এক ঘণ্টা খোঁড়ার পর কোদালে একটা শক্ত জিনিসে ঠেকল। তারপর ধীরে ধীরে মাটি সরানো হলো। আর যা বেরিয়ে এল, তা দেখে সবার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। একটা কঙ্কাল। একাই। পাঁচজনের সঙ্গে নয়। আলাদা। মনে হলো তাড়াহুড়ো করে কবর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আসল বিস্ময় ছিল অন্য জায়গায়।কঙ্কালের গলায় একটা লোহার তাবিজ ঝুলছে। তাবিজটা দেখে হঠাৎ অমিয় সেনের মুখ বদলে গেল।
—এটা আমি চিনি।
অরিন্দম অবাক।
—আপনি?
—হ্যাঁ।
তিনি নিচু হয়ে তাবিজটা হাতে নিলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—এটা গ্রামের পুরনো চৌকিদার গোপাল সরকারের।
অরিন্দম হতবাক।
—কিন্তু উনি তো নিখোঁজ হয়েছিলেন!
—ঠিক তাই।
প্রায় পঁচিশ বছর আগে।
কেউ জানত না উনি কোথায় গেলেন।
আজ উত্তর পাওয়া গেল।
সন্ধ্যার আগে থানায় ফিরে পুরনো রেকর্ড বের করা হলো। ফাইল খুলতেই নতুন সত্য সামনে এল। গোপাল সরকার নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন আগে থানায় একটা গোপন অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন। অভিযোগে লেখা ছিল— তিনি সন্দেহ করছেন, হরিবল্লভ সাহা কয়েকজন কৃষককে হত্যা করেছে।
কিন্তু তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তিনি উধাও হয়ে যান।
অমিয় সেন ফাইল বন্ধ করলেন। ঘরে নীরবতা। অরিন্দম ধীরে বলল, —তাহলে উনিও খুন হয়েছিলেন।
—হ্যাঁ।
—কারণ তিনি সত্য জানতেন।
অমিয় সেন মাথা নাড়লেন। এখন ছবিটা অনেকটাই পরিষ্কার। পাঁচজন কৃষক। আর একজন সাক্ষী। মোট ছয়জন। শালবনের নিচে চাপা পড়ে ছিল ছয়টি জীবন।
সেই রাতেই মহাদেব সাহার বাড়িতে ঘটল আরও অদ্ভুত ঘটনা। রাত তখন প্রায় দুটো। হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল। ঘরে অদ্ভুত ঠান্ডা। যেন বরফের হাওয়া বইছে।সে উঠে বসতেই দেখল— ঘরের মাঝখানে ছয়জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
না, পুরো মানুষ নয়। ছায়া। অস্পষ্ট অবয়ব।কিন্তু তাদের মুখে গভীর যন্ত্রণা।
মহাদেবের বুক কেঁপে উঠল। সে চিৎকার করতে গেল। পারল না। গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না। ছয়টি ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল। তারপর ভয়ংকর নেকি বেদনাময় অট্টহাসি। মহাদেবের মনে হলো আকাশ বাতাস ভেদ করে সেই হাসি যেন চারিদিকে ছড়িয়ে গেল। তারপরেই ফিসফিসিয়ে কর্কশ গলায় একসাথে বলে উঠলো, “চাপা থাকা সত্যের প্রকাশ চাই, সত্যের প্রকাশ চায়, সত্যের প্রকাশ চাই, আবার আসবো, আবার আসবো, আবার আসবো”। আবার সেই অট্টহাসি। মুহূর্তের মধ্যে সব মিলিয়ে গেল।
মহাদেব আর ঘুমোতে পারল না।
নবম অধ্যায়: উত্তরাধিকার
সকালের আলো ফুটলেও মহাদেব সাহার বাড়িতে যেন রাতই রয়ে গেল। সারারাত এক মুহূর্তও চোখ বুজতে পারেনি সে।
সেই সেই অট্টহাসি সেই কর্কশ অনুরোধ অথবা হুমকি যেন এখনো ঘর জুড়ে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। কথাগুলো যেন কোনও অদৃশ্য হাতুড়ির মতো তার বিবেকের ওপর আঘাত করছিল। বহু বছর ধরে যে স্মৃতিগুলোকে সে জোর করে মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিল, সেগুলো একে একে জেগে উঠতে শুরু করেছে।
সেইদিন দুপুরে নিত্যানন্দ তাকে দেখতে এলো। মহাদেবকে দেখে সে চমকে উঠল। মাত্র কয়েকদিনে লোকটার বয়স যেন দশ বছর বেড়ে গেছে। চোখের নীচে গভীর কালি। গালের হাড় বেরিয়ে এসেছে।
নিত্যানন্দ বলল, —আপনি এভাবে চললে বাঁচবেন না।
মহাদেব ফাঁকা চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল, —আমি কি বাঁচার যোগ্য?
নিত্যানন্দ থমকে গেল। —হঠাৎ এমন কথা?
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর মহাদেব বলল, —তুই কি জানিস, আমার বাবা শুধু ওই পাঁচজনকে মারেনি?
নিত্যানন্দের বুক ধক করে উঠল। —মানে?
—সব সত্যি তোকে কোনওদিন বলিনি।
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। বাইরে কালো মেঘ জমছে। দূরে বাজ পড়ল।মহাদেব ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
পঁচিশ বছর আগে… তখন সে যুবক। তার বাবা হরিবল্লভ সাহা এখনও গ্রামের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ। একদিন রাতে সে দুর্ঘটনাবশত এমন একটা ঘটনা দেখে ফেলে, যা তার জীবন বদলে দেয়। সেদিন গভীর রাতে বাড়ির গুদামঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে কয়েকজন লোকের কথা শুনতে পায়। গলা ছিল তার বাবার। আরও কয়েকজন লেঠেলের। তারা কথা বলছিল গোপাল চৌকিদারকে নিয়ে। গোপাল তখন থানায় খবর দিতে চলেছে। সে অনেক কিছু জেনে ফেলেছে। তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।
মহাদেব তখন ভেবেছিল, তারা শুধু ভয় দেখাবে। কিন্তু কয়েকদিন পরে গোপাল হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। আর সেই রাতেই সে তার বাবার জামায় রক্তের দাগ দেখেছিল। সেই দৃশ্য আজও তার চোখে ভাসে।
নিত্যানন্দ নিঃশব্দে শুনছিল।তারপর বলল,
—তাহলে আপনি সব জানতেন?
মহাদেব চোখ নামিয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
—তবু কাউকে বলেননি?
—ভয় পেয়েছিলাম।
—নাকি সম্পত্তি হারানোর ভয় ছিল?
প্রশ্নটা ছুরির মতো বিঁধল। মহাদেব উত্তর দিতে পারল না। কারণ সে নিজেও জানে, সত্যিটা ঠিক কোনটা।
সেই সন্ধ্যায় অরিন্দম ও অমিয় সেন আবার দেখা করলেন। তদন্ত এখন একেবারে শেষ পর্যায়ে। হরেকৃষ্ণের জবানবন্দি। গোপালের কঙ্কাল। পুরনো নথি। সবকিছু মিলিয়ে ছবিটা প্রায় পরিষ্কার। তবুও একটা প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। এই সমস্ত অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে কে? কেউ কি ইচ্ছে করে মহাদেবকে ভয় দেখাচ্ছে? নাকি সত্যিই কোনও অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে?
অমিয় সেন যুক্তিবাদী মানুষ। তবু তিনি স্বীকার করলেন—
—জীবনে অনেক অপরাধ দেখেছি। কিন্তু এই কেসে কিছু ঘটনা আছে, যার ব্যাখ্যা আমি দিতে পারছি না।
অরিন্দম জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—সব সত্যি কি যুক্তি দিয়ে বোঝা যায়?
অমিয় সেন উত্তর দিলেন না।
সেই রাতেই ঝড় শুরু হলো। বছরের সবচেয়ে ভয়ংকর ঝড়। আকাশে একের পর এক বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। শালবনের গাছগুলো প্রচণ্ড হাওয়ায় কাঁপছে। মনে হচ্ছে, পুরো বন যেন অস্থির হয়ে উঠেছে। রাত প্রায় বারোটার সময় মহাদেব হঠাৎ একটা শব্দ শুনল। কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছে।
—মহাদেব…
সে চমকে উঠল। চারদিক নিস্তব্ধ। কিছুক্ষণ পর আবার—
—মহাদেব…
এইবার শব্দটা আরও স্পষ্ট।
বাড়ির বাইরে থেকে আসছে। সে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আর তারপর তার শরীর অবশ হয়ে গেল। বাড়ির উঠোনে ছয়টি ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।
বৃষ্টির মধ্যে। নিঃশব্দে। তাদের মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তারা সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঠিক সেই সময় বিদ্যুৎ চমকাল। এক মুহূর্তের জন্য মুখগুলো দেখা গেল। আর মহাদেব চিনে ফেলল।
রঘুনাথ। গণেশ। মকবুল। হরিপদ। জীতেন। গোপাল।
মহাদেব পিছিয়ে গেল। তার পা কাঁপছে। হৃদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছে। কিন্তু ছায়ামূর্তিগুলো এগোচ্ছে না। শুধু দাঁড়িয়ে আছে। যেন অপেক্ষা করছে। কিসের?
হঠাৎ তার মনে পড়ল— একটা কথা। বহু বছর আগে মৃত্যুর আগে তার বাবা বলেছিল— “যে সত্যকে কবর দিয়ে গেলাম, সে একদিন কবর ফুঁড়ে ফিরে বেরিয়ে আসবে, তুই শুধু তাকে স্বীকার করে নেবি।”
তখন কথাটার অর্থ বোঝেনি। আজ বুঝল। খুব ভালো করেই বুঝল। আর সেই উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার মনে একটা সিদ্ধান্ত জন্ম নিল। পালিয়ে নয়। লুকিয়ে নয়। সম্ভবত এবার সত্যিটা স্বীকার করার সময় এসেছে। কারণ বিচার যত দেরিতেই আসুক— সে একদিন আসবেই।
দশম অধ্যায়: অশরীরীর বিচার
সারারাত ঝড় চলল। শালবনের মাথার উপর দিয়ে বাতাস ছুটে গেল উন্মাদের মতো। আকাশে একের পর এক বিদ্যুৎ চমকাল। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, যেন বনভূমির গভীর থেকে হাজার মানুষের দীর্ঘশ্বাস উঠে আসছে। মহাদেব সাহা আর ঘরে থাকতে পারল না। ভোর হওয়ার আগেই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। পঁচিশ বছরের বোঝা আর বয়ে বেড়াবে না। সত্যিটা আজ প্রকাশ করতেই হবে।
সকালে শালবনিয়া হাটের মাঠে অস্বাভাবিক ভিড় জমল। খবর ছড়িয়ে পড়েছে।মহাদেব সাহা নাকি গ্রামের লোকজনকে ডেকেছে।
অরিন্দম এল। অমিয় সেন এলেন। গ্রামের বৃদ্ধ, যুবক, নারী, পুরুষ—সকলেই উপস্থিত। সকালের আকাশ এখনও মেঘলা। মহাদেবকে দেখে অনেকে চমকে উঠল। লোকটা যেন এক রাতেই বুড়ো হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে হাটের মাঝখানে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ কারও দিকে তাকাতে পারল না। তারপর কাঁপা গলায় বলল—
—আজ আমি একটা পাপের কথা স্বীকার করতে এসেছি।
মুহূর্তের মধ্যে মাঠ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
—আমার বাবা হরিবল্লভ সাহা নির্দোষ মানুষদের সর্বনাশ করেছিল। জমি কেড়ে নিয়েছিল। মিথ্যা মামলা দিয়েছিল। আর…
সে থেমে গেল। গলাটা শুকিয়ে এসেছে।
—আর ছয়জন মানুষকে হত্যা করেছিল।
জনতার মধ্যে চাপা গুঞ্জন উঠল। মহাদেব চোখ বন্ধ করল।
—আমি খুন করিনি। কিন্তু আমি সত্যিটা জানতাম। আমি চুপ ছিলাম। আমি অপরাধীদের আড়াল করেছি। তাই আমিও অপরাধী।
অমিয় সেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। অরিন্দমও কিছু বলল না।
মহাদেব আবার বলল—
—আমি এই গ্রামের কাছে ক্ষমা চাই।
তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।
—আর আমার সমস্ত জমি, যা অন্যায়ভাবে নেওয়া হয়েছে, তার হিসাব নতুন করে করা হবে। যাদের প্রাপ্য, তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
মাঠের মানুষজন একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। এত বড় কথা কেউ কল্পনাও করেনি।
ঠিক তখনই আকাশে বজ্রপাত হলো। এত জোরে যে সবাই চমকে উঠল। বজ্রের আলো এক মুহূর্তের জন্য শালবনের দিকটাকে আলোকিত করে দিল।
আর সেই মুহূর্তেই অনেকেই দেখল— বনের ধারে ছয়টি আবছা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে।নাকি সেটা আলো-ছায়ার খেলা? কেউ নিশ্চিত হতে পারল না। পরের মুহূর্তেই সব মিলিয়ে গেল।
সেদিন বিকেলে অমিয় সেন থানায় মহাদেবের স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করলেন।আইন অনুযায়ী পুরনো হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নতুন করে শুরু হলো। হরেকৃষ্ণের সাক্ষ্য, উদ্ধার হওয়া কঙ্কাল, পুরনো নথি—সব একসঙ্গে যুক্ত হলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই দিনের পর থেকে আর কোনও অদ্ভুত ঘটনা ঘটল না।কোনও পায়ের ছাপ নয়। কোনও ছায়ামূর্তি নয়। কোনও ফিসফিসানি নয়। শালবন আবার আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যেন কেউ তার কাজ শেষ করে চলে গেছে।
( সমাপ্ত)
