গোপালন ও পশুস্বাস্থ্য · voiceunfiltered.com

স্তন্যগ্রন্থির প্রদাহ
ঠুনকা বা Mastitis

বিস্তারিত আলোচনা

গো-পালকেরা যে সমস্যার সম্মুখীন সবচেয়ে বেশি হন এবং যা গোপালন শিল্পের সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ, তা হল ম্যাসটাইটিস বা ঠুনকা রোগ। দুগ্ধ গ্রন্থি বা গাভীর পালানের প্রদাহকে ঠুনকা বা ম্যাসটাইটিস বলা হয়। এটি মূলত সংক্রামক রোগ, তবে আঘাত এবং বাঁট ও পালানের উপরের ক্ষত অনেক সময় এই রোগ হওয়ার পথ সহজ করে দেয়।

কোন কোন জীবাণু দ্বারা ঠুনকা হয়

পশ্চিমবঙ্গের গোয়ালঘরে সাধারণত যে জীবাণুগুলোর প্রভাবে ঠুনকা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, সেগুলো মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায় —

গাভী থেকে গাভীতে ছড়ায় এমন জীবাণু

Staphylococcus aureus

এই জীবাণু ঔষধ প্রয়োগেও সহজে সারে না, এবং পালান পচে যাওয়া (গ্যাংগ্রিনাস) ম্যাসটাইটিসের একটি প্রধান কারণ।

Streptococcus agalactiae

পালানে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ ঘটায় এবং প্রায়ই কোনো বাহ্যিক লক্ষণ ছাড়াই (সাব-ক্লিনিক্যাল) দুধ উৎপাদন কমিয়ে দেয়।

গোয়ালঘরের পরিবেশ থেকে ছড়ায় এমন জীবাণু

Escherichia coli (E. coli)

হঠাৎ তীব্র আকারে দেখা দেয়, দ্রুত জ্বর ও শরীর খারাপ করে; সবচেয়ে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন এমন ধরনের ঠুনকার জন্য প্রধানত দায়ী।

Klebsiella pneumoniae

E. coli-র মতোই আচরণ করে, নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে বিছানায় থাকা গাভীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

এই চারটি জীবাণুই পশ্চিমবঙ্গের খামারগুলোতে ঠুনকার বেশিরভাগ ঘটনার জন্য দায়ী। এদের মধ্যে প্রথম দুটি (Staph ও Strep) দোয়ার সময়ের পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, আর পরের দুটি (E. coli ও Klebsiella) গোয়ালঘরের পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে যুক্ত।

পালানে জীবাণু কীভাবে প্রবেশ করে

ঠুনকা রোগের বিভিন্ন রূপ

অ্যাকিউট বা সাব-অ্যাকিউট — পালানের একটি বা একাধিক প্রকোষ্ঠ হঠাৎ অত্যধিক ফুলে ওঠে, ছুঁলে ব্যথা লাগে, এবং বাঁট দিয়ে জলের মতো বা রক্তমিশ্রিত তরল বার হয়। জীবাণুর ধরন অনুযায়ী দুধ ছানাকাটা, পাতলা পুঁজ বা গাঢ় মাখনের মতো হয়ে যেতে পারে। সঙ্গে ১০৪–১০৫°F জ্বর ও খাওয়া একেবারে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুতর অবস্থায় (গ্যাংগ্রিনাস ম্যাসটাইটিস) ফোলা, লাল, গরম অংশটি দ্রুত নীল ও ঠান্ডা হয়ে যায় এবং সেই অংশে কোনো সাড়া থাকে না।

ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী) — রোগ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। পালানের একটি প্রকোষ্ঠ আক্রান্ত হলেও বাকি সুস্থ প্রকোষ্ঠ থেকে স্বাভাবিক দুধ পাওয়া যেতে পারে। ফোলা ও ব্যথা কম থাকে, জ্বরও তেমন হয় না, তবে খাওয়ায় কিছুটা অনীহা দেখা যায়। লক্ষণগুলো বারবার ফিরে আসে।

সাব-ক্লিনিক্যাল (লক্ষণহীন) — পালান বা দুধ দেখতে স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু দুধ উৎপাদন আপাত কারণ ছাড়াই কমতে থাকে বা দুধে ফ্যাটের পরিমাণ কমে যায়। এই ধরনটি সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি করে, কারণ খামারি প্রায়ই বুঝতেই পারেন না গাভী আক্রান্ত।

রোগ নির্ণয়

অ্যাকিউট, সাব-অ্যাকিউট বা ক্রনিক ম্যাসটাইটিস পালান ও দুধের ভৌত পরিবর্তন দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু সাব-ক্লিনিক্যাল অবস্থায় বাহ্যিক কোনো পরিবর্তন না থাকায় নিচের পরীক্ষাগুলো প্রয়োজন হয় —

চিকিৎসা (অ্যালোপ্যাথিক)

অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের পর নির্দিষ্ট সময় (withdrawal period) পর্যন্ত সেই দুধ বিক্রি বা ব্যবহার না করার নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

ঘরোয়া চিকিৎসা

এই পদ্ধতিগুলো অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা যায়, বিকল্প হিসেবে নয়। গুরুতর ক্ষেত্রে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধু ঘরোয়া উপায়ে নির্ভর করা উচিত নয়।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

সাব-ক্লিনিক্যাল ও ক্রনিক ম্যাসটাইটিসে সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে অনেক খামারি হোমিওপ্যাথিক ঔষধ ব্যবহার করেন। প্রয়োগমাত্রা ও নির্বাচন একজন যোগ্য ভেটেরিনারি হোমিওপ্যাথের পরামর্শ অনুযায়ী করা উচিত।

খামারির করণীয় — ঠুনকা প্রতিরোধে

সাধারণভাবে দেখা গেছে, বেশি দুধ দেয় এমন গাভীদের মধ্যে ঠুনকার প্রকোপ বেশি হয়। এবং বেশিরভাগ সংক্রমণ বাঁটের মধ্য দিয়েই ঘটে। তাই নিত্যনৈমিত্তিক পরিচ্ছন্নতাই ঠুনকা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।