গো-পালকেরা যে সমস্যার সম্মুখীন সবচেয়ে বেশি হন এবং যা গোপালন শিল্পের সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ, তা হল ম্যাসটাইটিস বা ঠুনকা রোগ। দুগ্ধ গ্রন্থি বা গাভীর পালানের প্রদাহকে ঠুনকা বা ম্যাসটাইটিস বলা হয়। এটি মূলত সংক্রামক রোগ, তবে আঘাত এবং বাঁট ও পালানের উপরের ক্ষত অনেক সময় এই রোগ হওয়ার পথ সহজ করে দেয়।
◼ কোন কোন জীবাণু দ্বারা ঠুনকা হয়
পশ্চিমবঙ্গের গোয়ালঘরে সাধারণত যে জীবাণুগুলোর প্রভাবে ঠুনকা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, সেগুলো মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায় —
গাভী থেকে গাভীতে ছড়ায় এমন জীবাণু
Staphylococcus aureus
এই জীবাণু ঔষধ প্রয়োগেও সহজে সারে না, এবং পালান পচে যাওয়া (গ্যাংগ্রিনাস) ম্যাসটাইটিসের একটি প্রধান কারণ।
Streptococcus agalactiae
পালানে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ ঘটায় এবং প্রায়ই কোনো বাহ্যিক লক্ষণ ছাড়াই (সাব-ক্লিনিক্যাল) দুধ উৎপাদন কমিয়ে দেয়।
গোয়ালঘরের পরিবেশ থেকে ছড়ায় এমন জীবাণু
Escherichia coli (E. coli)
হঠাৎ তীব্র আকারে দেখা দেয়, দ্রুত জ্বর ও শরীর খারাপ করে; সবচেয়ে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন এমন ধরনের ঠুনকার জন্য প্রধানত দায়ী।
Klebsiella pneumoniae
E. coli-র মতোই আচরণ করে, নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে বিছানায় থাকা গাভীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
এই চারটি জীবাণুই পশ্চিমবঙ্গের খামারগুলোতে ঠুনকার বেশিরভাগ ঘটনার জন্য দায়ী। এদের মধ্যে প্রথম দুটি (Staph ও Strep) দোয়ার সময়ের পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, আর পরের দুটি (E. coli ও Klebsiella) গোয়ালঘরের পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে যুক্ত।
◼ পালানে জীবাণু কীভাবে প্রবেশ করে
- বাঁটের ক্ষত দিয়ে — কাঁটাতার, রুক্ষ মেঝে বা পোকামাকড়ের কামড়ে তৈরি ক্ষতের মধ্য দিয়ে জীবাণু সহজে ঢুকে পড়ে।
- দোয়ার সময় হাত থেকে — একই হাতে একাধিক গাভী দোয়ানো হলে, হাত না ধুলে সংক্রমিত গাভী থেকে সুস্থ গাভীতে জীবাণু ছড়ায়।
- মিল্কিং মেশিন থেকে — টিট কাপ যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত না করলে একই মেশিনের মাধ্যমে একাধিক গাভী সংক্রমিত হতে পারে।
- নোংরা মেঝে বা বিছানা থেকে — গোবরযুক্ত, স্যাঁতসেঁতে জায়গায় গাভী বসলে বাঁটের মুখ দিয়ে জীবাণু প্রবেশ করে। দোয়ার পর অন্তত আধ ঘণ্টা বাঁটের মুখ খোলা থাকে বলে এই সময়টা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
- শরীরের অন্য কোনো সংক্রমণ থেকে — কোনো কারণে শরীরে সংক্রমণ থাকলে রক্তের মাধ্যমে জীবাণু পালানে গিয়েও পৌঁছাতে পারে, যদিও এটি তুলনামূলক কম দেখা যায়।
◼ ঠুনকা রোগের বিভিন্ন রূপ
অ্যাকিউট বা সাব-অ্যাকিউট — পালানের একটি বা একাধিক প্রকোষ্ঠ হঠাৎ অত্যধিক ফুলে ওঠে, ছুঁলে ব্যথা লাগে, এবং বাঁট দিয়ে জলের মতো বা রক্তমিশ্রিত তরল বার হয়। জীবাণুর ধরন অনুযায়ী দুধ ছানাকাটা, পাতলা পুঁজ বা গাঢ় মাখনের মতো হয়ে যেতে পারে। সঙ্গে ১০৪–১০৫°F জ্বর ও খাওয়া একেবারে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুতর অবস্থায় (গ্যাংগ্রিনাস ম্যাসটাইটিস) ফোলা, লাল, গরম অংশটি দ্রুত নীল ও ঠান্ডা হয়ে যায় এবং সেই অংশে কোনো সাড়া থাকে না।
ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী) — রোগ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। পালানের একটি প্রকোষ্ঠ আক্রান্ত হলেও বাকি সুস্থ প্রকোষ্ঠ থেকে স্বাভাবিক দুধ পাওয়া যেতে পারে। ফোলা ও ব্যথা কম থাকে, জ্বরও তেমন হয় না, তবে খাওয়ায় কিছুটা অনীহা দেখা যায়। লক্ষণগুলো বারবার ফিরে আসে।
সাব-ক্লিনিক্যাল (লক্ষণহীন) — পালান বা দুধ দেখতে স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু দুধ উৎপাদন আপাত কারণ ছাড়াই কমতে থাকে বা দুধে ফ্যাটের পরিমাণ কমে যায়। এই ধরনটি সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি করে, কারণ খামারি প্রায়ই বুঝতেই পারেন না গাভী আক্রান্ত।
◼ রোগ নির্ণয়
অ্যাকিউট, সাব-অ্যাকিউট বা ক্রনিক ম্যাসটাইটিস পালান ও দুধের ভৌত পরিবর্তন দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু সাব-ক্লিনিক্যাল অবস্থায় বাহ্যিক কোনো পরিবর্তন না থাকায় নিচের পরীক্ষাগুলো প্রয়োজন হয় —
- স্ট্রিপ কাপ পরীক্ষা — দোয়ার প্রথম কয়েক ফোঁটা দুধ কালো পাত্রে ফেলে দলা বা পুঁজ আছে কিনা দেখা।
- ক্যালিফোর্নিয়া ম্যাসটাইটিস টেস্ট (CMT) — খামার-স্তরেই সহজে করা যায়, সাব-ক্লিনিক্যাল ম্যাসটাইটিস ধরার জন্য উপযোগী।
- ল্যাব পরীক্ষা — গুরুতর বা বারবার ফিরে আসা সংক্রমণে সঠিক জীবাণু ও কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক জানতে ল্যাবরেটরিতে দুধের নমুনা পাঠানো উচিত।
◼ চিকিৎসা (অ্যালোপ্যাথিক)
- দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা — অ্যাকিউট ও সাব-অ্যাকিউট ম্যাসটাইটিসে যত দ্রুত ইনজেকশনের মাধ্যমে ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রদাহনাশক ঔষধ শুরু করা যায়, ভালো ফলের আশা তত বেশি।
- পালান নিয়মিত খালি করা — প্রতি ৪–৬ ঘণ্টা অন্তর হাত দিয়ে পালানের জমা পদার্থ সম্পূর্ণ খালি করলে জীবাণুর সংখ্যা কমে আসে।
- বাঁটের মধ্য দিয়ে ইনফিউসন — সরাসরি বাঁট দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক ইনফিউসন দেওয়া হয়। এর সঙ্গে স্ট্রেপ্টোকাইনেজ বা স্ট্রেপ্টোডরনেজ মেশালে জমাট বাঁধা পুঁজ গলে গিয়ে ইনফিউসন আরও কার্যকর হয়।
- ব্যথা ও জ্বর কমানো — প্রয়োজনে ব্যথানাশক ও জ্বর কমানোর ঔষধ ইনজেকশনের মাধ্যমে দিতে হয়।
- গরম সেঁক — রোগের প্রাথমিক অবস্থায় ম্যাগনেসিয়াম সালফেট মেশানো গরম জলে সেঁক দিলে ফোলা ও ব্যথা কমে।
- তরল থেরাপি — বিশেষত E. coli-জনিত গুরুতর ম্যাসটাইটিসে শরীর দুর্বল হয়ে পড়লে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
- ক্রনিক ও সাব-ক্লিনিক্যাল ক্ষেত্রে — দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিবায়োটিক ইনফিউসন লাগে, এবং সম্ভব হলে ল্যাব পরীক্ষা করে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক বেছে নেওয়া ভালো ফল দেয়।
- ড্রাই কাউ থেরাপি — ল্যাকটেশন শেষে দুধ বন্ধ করার সময় প্রতিটি প্রকোষ্ঠে দীর্ঘস্থায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ইনফিউসন দিলে পরের বিয়ানোর সময় সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
◼ ঘরোয়া চিকিৎসা
এই পদ্ধতিগুলো অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা যায়, বিকল্প হিসেবে নয়। গুরুতর ক্ষেত্রে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধু ঘরোয়া উপায়ে নির্ভর করা উচিত নয়।
- অ্যালোভেরা ও কাঁচা হলুদের মিশ্রণ — অ্যালোভেরার শাঁস ও কাঁচা হলুদ বাটা একসঙ্গে মিশিয়ে পালানের ফোলা অংশে লাগালে প্রদাহ ও জ্বালা কমাতে সাহায্য করে।
- গরম-ঠান্ডা সেঁক পর্যায়ক্রমে — প্রাথমিক অবস্থায় গরম সেঁক এবং পরে ঠান্ডা সেঁক দিলে রক্ত চলাচল ভালো হয়, ফোলা কমে।
- সরিষার তেল মালিশ — হালকা গরম সরিষার তেল দিয়ে আলতো মালিশ করলে ব্যথা কমাতে সহায়ক হয় (ক্ষত থাকলে এড়িয়ে চলা উচিত)।
- ঘন ঘন দোয়ানো — যতটা সম্ভব সাবধানে হাত দিয়ে বারবার পালান খালি রাখা, যাতে জমে থাকা দুধে জীবাণু বংশবৃদ্ধি করতে না পারে।
- সহজপাচ্য খাদ্য — জ্বর থাকা অবস্থায় ভারী দানাদার খাদ্য কমিয়ে সহজপাচ্য কাঁচা ঘাস ও পর্যাপ্ত জল দেওয়া উচিত।
◼ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা
সাব-ক্লিনিক্যাল ও ক্রনিক ম্যাসটাইটিসে সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে অনেক খামারি হোমিওপ্যাথিক ঔষধ ব্যবহার করেন। প্রয়োগমাত্রা ও নির্বাচন একজন যোগ্য ভেটেরিনারি হোমিওপ্যাথের পরামর্শ অনুযায়ী করা উচিত।
- Belladonna — পালান হঠাৎ লাল, গরম, ফোলা ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর হলে প্রাথমিক অবস্থায় ব্যবহৃত হয়।
- Bryonia alba — পালান শক্ত, শুকনো এবং নড়াচড়ায় ব্যথা বাড়লে উপযোগী।
- Phytolacca decandra — পালানে গোটা বা দলা অনুভূত হলে এবং দুধ ছানাকাটা ধরনের হলে ব্যবহৃত হয়; ম্যাসটাইটিসের অন্যতম প্রধান হোমিওপ্যাথিক ঔষধ হিসেবে পরিচিত।
- Hepar sulphuris calcareum — পুঁজ জমে গেলে বা ফোঁড়ার মতো অবস্থা তৈরি হলে সহায়ক।
- Silicea — দীর্ঘস্থায়ী ম্যাসটাইটিসে, যেখানে পালান বারবার ফুলে ওঠে ও সারতে সময় লাগে।
◼ খামারির করণীয় — ঠুনকা প্রতিরোধে
সাধারণভাবে দেখা গেছে, বেশি দুধ দেয় এমন গাভীদের মধ্যে ঠুনকার প্রকোপ বেশি হয়। এবং বেশিরভাগ সংক্রমণ বাঁটের মধ্য দিয়েই ঘটে। তাই নিত্যনৈমিত্তিক পরিচ্ছন্নতাই ঠুনকা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
- গোয়ালঘর পরিষ্কার রাখা — ফিনাইল, লাইজল ইত্যাদি দিয়ে গোয়ালঘর ও মিল্কিং শেড নিয়মিত জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে; মেঝে যেন স্যাঁতসেঁতে বা গোবরযুক্ত না থাকে।
- দোয়ার আগে-পরে জীবাণুনাশক ব্যবহার — হাতে দোয়া হলে প্রতিটি গাভী দোয়ার আগে হাত এবং পালান জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। দোয়ার পর টিট ডিপিং (আয়োডিনযুক্ত দ্রবণে বাঁট ডোবানো) করলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কমে।
- মিল্কিং মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ — টিট কাপ যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে এবং খোলার সময় সাবধান থাকতে হবে যাতে বাঁটে আঘাত না লাগে।
- দোয়ার পর গাভীকে দাঁড় করিয়ে রাখা — দোয়ার পর অন্তত আধ ঘণ্টা গাভীকে বসতে না দিয়ে খড় বা দানাদার খাবার দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা উচিত, যাতে বাঁটের খোলা মুখ দিয়ে জীবাণু ঢুকতে না পারে।
- নিয়মিত পালান পরীক্ষা — সপ্তাহে অন্তত একবার স্ট্রিপ কাপ পরীক্ষা বা CMT করে সাব-ক্লিনিক্যাল সংক্রমণ আগেভাগে ধরা যায়।
- ড্রাই কাউ থেরাপি মেনে চলা — ল্যাকটেশনের শেষে হঠাৎ দোয়া বন্ধ না করে, শেষ দোয়ার পর পালানে অ্যান্টিবায়োটিক ইনফিউসন দিয়েই ড্রাই করা উচিত।
- আক্রান্ত গাভী আলাদা রাখা — সংক্রমিত গাভীকে সুস্থ গাভী থেকে আলাদা রেখে সবার শেষে দোয়া করা এবং তার সরঞ্জাম আলাদা রাখা।
- সুষম খাদ্য — পর্যাপ্ত ভিটামিন ই ও সেলেনিয়াম-সহ সুষম খাদ্য গাভীর প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
- নিয়মিত পশু চিকিৎসক পরিদর্শন — মাসে অন্তত একবার খামার পরিদর্শন করালে প্রাথমিক অবস্থাতেই সমস্যা চিহ্নিত করা যায়।