এক সুতোয় বাঁধা মানব — রবীন্দ্রনাথের গানে মানবতার বার্তা
২৫ বৈশাখ | রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী বিশেষ প্রবন্ধ
ভূমিকা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১ — ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন একাধারে বাঙালি কবি, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক। তাঁকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়। কিন্তু তাঁর গান শুধু সৌন্দর্যের উদযাপন নয়— তাঁর কাব্যসাহিত্যের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য মানবপ্রেম, বিশ্বপ্রেম এবং সামাজিক ভেদাভেদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান। তাঁর প্রতিটি গানের গভীরে আছে এক অনন্ত দার্শনিক অনুসন্ধান— মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার সাধনা। জাত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা শ্রেণির সংকীর্ণ বিভাজনের বিরুদ্ধে তিনি গড়ে তুলেছিলেন মানবতার এক বিশাল মন্দির। আজ তাঁর জন্মজয়ন্তীতে, সেই অবিনশ্বর গানের পঙ্ক্তিগুলো ধরে ফিরে দেখা যাক মানুষ রবীন্দ্রনাথকে।
প্রথম গান
“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” এই গানটি রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ পর্যায়ের এক অসাধারণ সৃষ্টি। সমাজ যখন মানুষকে একা করে দেয়, ধর্ম বা জাতের নামে বিচ্ছিন্ন করে দেয়— তখনও মানবতার পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায় এই গান। “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।” এই “একলা চলা” নিঃসঙ্গতার প্রতীক নয়, বরং বিবেকের স্বাধীনতার প্রতীক। সত্যের পথে দাঁড়িয়ে নিজের মানবিক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়াই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়— রবীন্দ্রনাথ যেন সেই কথাই বলেছেন। মহাত্মা গান্ধী তাঁর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হিসেবে এই গানকে কাছে রেখেছিলেন। কারণ এই গানের ভেতরে আছে প্রতিবাদ, সাহস এবং মানবিক জাগরণের এক চিরন্তন আহ্বান।
দ্বিতীয় গান
“ওই মহামানব আসে” “ওই মহামানব আসে। দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে, মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে।” “ওই মহামানব আসে” গানটি রবীন্দ্রনাথের আনুষ্ঠানিক সংগীত পর্যায়ভুক্ত। কিন্তু এই “মহামানব” কোনো অলৌকিক অবতার নন। তিনি সেই মানুষ— যিনি সমস্ত বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সমগ্র মানবজাতিকে এক সুতোয় বাঁধতে পারেন। “দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে, মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে”— এই পঙ্ক্তিতে কবি যেন বলছেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের সম্ভাবনায় সমগ্র পৃথিবী শিহরিত হয়ে ওঠে। প্রকৃতিও আনন্দিত হয় যখন মানুষ মানুষের কাছে ফিরে আসে।
তৃতীয় গান
“আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে” “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে, এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে।” এই গানে রবীন্দ্রনাথ আত্মার শুদ্ধতার কথা বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষকে শুদ্ধ হতে হয় ভেতর থেকে— বাইরের আচার-অনুষ্ঠান দিয়ে নয়। “দহন-দান” অর্থাৎ নিজেকে জ্বালিয়ে অন্যের জীবনে আলো দেওয়াই প্রকৃত ধর্ম। যে ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে, মানুষে মানুষে ঘৃণা সৃষ্টি করে— তা কখনোই এই “আগুনের পরশমণি” হতে পারে না। এখানেই রবীন্দ্রনাথ জাত-ধর্মের সংকীর্ণতা ছাপিয়ে মানবিক আত্মার মুক্তিকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন।
চতুর্থ গান
“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে” “জানি নে তোর ধন-রতন আছে কি না রানী, মাটির ঢেলা সোনা করা তোমার ছোঁয়া জানি।” এই পঙ্ক্তির ভেতরে লুকিয়ে আছে অসাধারণ মানবদর্শন। “মাটির ঢেলা সোনা করা”— এখানে কবি বুঝিয়েছেন, এই দেশের সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষই প্রকৃত সম্পদ। কোনো জাত-পরিচয় নয়, কোনো বংশগৌরব নয়— শুধু মাটির সন্তান হওয়াটাই মানুষের গর্ব। আজকের বিভাজিত সমাজে এই দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
পঞ্চম গান
“একটি নমস্কারে হে ধরণী” রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে বারবার ধরণী বা মাটিকে প্রণাম জানিয়েছেন। এই মাটি কোনো একক ধর্মের নয়, কোনো নির্দিষ্ট জাতির নয়। এই মাটিতে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলের জন্ম, সকলের মৃত্যু। মাটির কাছে সবাই সমান— রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বদেশ পর্যায়ের গানে বারবার এই গভীর সত্যটিই উচ্চারণ করেছেন। লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মিলন বাউল দর্শনের প্রভাব লালন ফকির-এর গান ও দর্শনের প্রতি রবীন্দ্রনাথের গভীর আকর্ষণ ছিল।
তিনি লালনের ২৯০টি গান সংগ্রহ করেছিলেন এবং তাঁর ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ২০টি গান প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীকালে লালনের গানের প্রভাবেই রবীন্দ্রনাথ বহু গান রচনা করেন। লালনের বিখ্যাত উচ্চারণ— “জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা” এই দর্শনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদের গভীর মিল রয়েছে। লালনের মতে, মনুষ্যত্বই মানুষের প্রকৃত পরিচয়; জাতপাতের অহংকার অর্থহীন। রবীন্দ্রনাথও তাঁর গানে একই সত্যকে ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করেছেন।
“মানুষের ধর্ম” রবীন্দ্রদর্শনের দার্শনিক ভিত্তি ১৯৩৩ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ “কমলা বক্তৃতা” প্রদান করেন, যা পরে “মানুষের ধর্ম” নামে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে তিনি মানুষের ভেতরে দুই ধরনের ধর্মের কথা বলেছেন— একটি জৈব ধর্ম, অন্যটি মানসধর্ম। তাঁর গানগুলো আসলে এই মানসধর্মেরই সুরেলা প্রকাশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ তখনই মহৎ হয়ে ওঠে যখন সে নিজের ক্ষুদ্র পরিচয় অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে একাত্ম হতে শেখে। তিনি লিখেছিলেন— যে মহামানব সকল মানবের ঐক্যের মধ্যে নিজের বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করেন, মানুষ নানা নামে তাঁকেই পূজা করেছে। এই দর্শনই তাঁর গানের প্রতিটি সুরে, প্রতিটি পঙ্ক্তিতে অনুরণিত হয়েছে।
আজকের প্রাসঙ্গিকতা আজ যখন ধর্মের নামে, জাতের নামে পৃথিবী জুড়ে মানুষ মানুষকে আঘাত করছে— তখন রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের কাছে এক সতর্কবার্তা, এক মানবিক স্মরণপত্র। লালনের মানবধর্মের সুরে সুর মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেন আজও আমাদের মনে করিয়ে দেন— “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া মানে শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়। এটি এক মানবিক ঘোষণা— আমি জাতের উপরে মানুষকে রাখি, ধর্মের উপরে মানবতাকে রাখি।
voiceunfiltered.com
২৫ বৈশাখ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী বিশেষ সংখ্যা
