— সম্পাদকীয় কলম
পশ্চিমবঙ্গ আবার এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ নির্বাচন-পর্বের পর নতুন সরকার শপথ নেবে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হবে, নতুন প্রতিশ্রুতির ভাষণ শোনা যাবে। গণতন্ত্রে এ এক স্বাভাবিক অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত। কারণ ক্ষমতা পরিবর্তন শুধু মুখ বদলের নাম নয়; এটি মানুষের আশা, ক্ষোভ, অভিমান ও ভবিষ্যতের নতুন প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ।
নতুন সরকারকে অভিনন্দন। বাংলার মানুষ চায়—এই রাজ্য আবার শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প ও মানবিকতার আলোয় নিজের গৌরব ফিরে পাক। তবে সেই পথ সহজ নয়। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মধ্যেই ভবিষ্যতের সাফল্য লুকিয়ে থাকে। তাই একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে নতুন প্রশাসনের কাছে কয়েকটি বিনীত প্রত্যাশা রইল।
প্রথমত, ক্ষমতায় এসেই নাম ও রঙ বদলের রাজনীতি থেকে বিরত থাকুন। একটি সরকার চলে যেতে পারে, কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের সম্পত্তি। শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতীকের প্রভাব বিস্তারের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ভবন, রাস্তা বা প্রকল্পের রঙ বদল সাধারণ মানুষের কাছে উন্নয়নের প্রতীক নয়, বরং অপচয়ের উদাহরণ। বাংলার মানুষ এখন কাজ দেখতে চায়, রঙ নয়।
দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার অহংকার যেন প্রশাসনের আচরণে না আসে। একজন নেতা বা মন্ত্রীর যাতায়াতের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ রাখা, সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা, অযথা নিরাপত্তার প্রদর্শন—এসব গণতন্ত্রকে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মানুষ সেই নেতাকেই মনে রাখে, যিনি জনতার ভিড়ে মিশে থাকতে পারেন।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো জরুরি। টলিউড বা শিল্প-সংস্কৃতির জগৎ কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষাকেন্দ্র হতে পারে না। শিল্পীর পরিচয় তার কাজ; তার রাজনৈতিক মত নয়। মতাদর্শের ভিত্তিতে সুযোগ বণ্টনের সংস্কৃতি শেষ হওয়া প্রয়োজন।
একইসঙ্গে নতুন সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে তথাকথিত “তোষামোদকারী বুদ্ধিজীবী”দের থেকে। ইতিহাস বলে, ক্ষমতার চারপাশে সবসময় একদল চাটুকার জন্ম নেয়, যারা সত্যকে আড়াল করে শুধু প্রশংসার শব্দ শোনাতে চায়। এরা কোনো সরকারের শক্তি নয়; বরং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করার অন্যতম কারণ।
গণতন্ত্রে সমালোচনা শত্রুতা নয়, বরং সংশোধনের সুযোগ। বিরোধী মতকে দমন করা, পুলিশি সন্ত্রাস, মিথ্যা মামলা কিংবা প্রশাসনিক প্রতিহিংসা—এসব স্বল্পমেয়াদে শক্তির প্রদর্শন হলেও দীর্ঘমেয়াদে জনরোষ তৈরি করে। মনে রাখতে হবে, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠের হলেও গণতন্ত্র সবার।
প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করাও আজ অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচন, বদলি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সবকিছু যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের উপর মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি।
আন্দোলনের ক্ষেত্রেও সংবেদনশীল হওয়া দরকার। কোনো দাবি বা ক্ষোভকে অবহেলা করা, আন্দোলনকারীদের শত্রু হিসেবে দেখা কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিবাদ থামানোর চেষ্টা—এসব পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। মানুষের কথা ধৈর্য নিয়ে শোনার মধ্যেই সুস্থ শাসনের পরিচয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার দাবি আজ সময়ের প্রয়োজন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক, স্বচ্ছ পরিবেশ ফিরে আসুক। একইভাবে স্কুল শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার দিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার নেতৃত্বে শিক্ষাবিদদের স্থান হওয়া উচিত, রাজনৈতিক ক্যাডারদের নয়।
সংখ্যালঘু উন্নয়নের নামে অনিয়ন্ত্রিত ও অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্রয় দেওয়ার বদলে, উন্নয়নের অর্থ যেন প্রকৃত শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতিতে ব্যয় হয়—এই প্রত্যাশাও অমূলক নয়। একইসঙ্গে শিক্ষার আধুনিকীকরণ জরুরি। নতুন প্রজন্মকে অতীতের গৌরবের গল্প শোনানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাদের ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর জন্যও প্রস্তুত করা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার শিক্ষা, ওয়েব ডিজাইন বা আধুনিক প্রযুক্তিকে স্কুল স্তরে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলার অর্থনীতির প্রশ্নেও বাস্তববাদী হওয়া জরুরি। শুধু ভাতাভিত্তিক রাজনীতি কোনো রাজ্যকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করতে পারে না। শিল্প, কর্মসংস্থান ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার বিস্তার ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি অসম্ভব। অবশ্যই সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন, তবে তা প্রকৃত প্রাপকদের কাছে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে পৌঁছানো আরও বেশি জরুরি।
সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যেন শুধুমাত্র দলীয় কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—এই আস্থা সাধারণ মানুষের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে। একইভাবে নিজের দলের মধ্যেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন। একনায়কতন্ত্র কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে পারে না; ইতিহাস বারবার তা প্রমাণ করেছে।
সবশেষে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা—সরকার যেন সত্যিই সকলের সরকার হয়ে ওঠে। সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু, শহর ও গ্রাম, সমর্থক ও বিরোধী—সবাই যেন অনুভব করে এই প্রশাসন তাদেরও। ভোট-পরবর্তী হিংসা, প্রতিশোধের রাজনীতি ও বিভাজনের সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত কঠোরভাবে।
ইতিহাস খুব নির্মম শিক্ষক। সে কাউকে চিরস্থায়ী ক্ষমতার নিশ্চয়তা দেয় না। যে সরকার মানুষের কণ্ঠ শুনতে ভুলে যায়, ইতিহাস একদিন তাকেও সরিয়ে দেয়। সময়টা পাঁচ বছর হোক বা পনেরো—গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই ফিরে যায়।
তাই নতুন সরকারের কাছে একটাই আবেদন—ক্ষমতাকে শাসনের নয়, সেবার মাধ্যম হিসেবে দেখুন। বাংলার মানুষ রঙের পরিবর্তন নয়, চরিত্রের পরিবর্তন দেখতে চায়।
